জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) লোক প্রশাসন বিভাগের প্রভাষক রিফা তাসফিয়ার বিরুদ্ধে একাডেমিক কার্যক্রম, প্রশাসনিক বিষয় ও আচরণ নিয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিভাগের একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে গত ১৮ জুন উপাচার্যের কাছে এসব অভিযোগের বিস্তারিত জানানো হলেও প্রায় সাড়ে তিন মাস পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো।
বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রিফা তাসফিয়া ২০২৩ সালের ১০ আগস্ট লোক প্রশাসন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ ওঠে। বিষয়গুলো নিয়ে বিভাগের একাডেমিক কমিটির একাধিক সভায় আলোচনা এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অভিযোগের অবসান হয়নি বলে বিভাগ থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১৮ জুন উপাচার্যের কাছে পাঠানো ওই প্রতিবেদনে বিভাগের বিভিন্ন সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এবং পরবর্তী পরিস্থিতির বিবরণ তুলে ধরা হয়। বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তৎকালীন বিভাগীয় সভাপতি অধ্যাপক হরে কৃষ্ণ কুন্ড প্রতিবেদনটি পাঠান।
বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা রিফা তাসফিয়ার পাঠদান করা পাবলিক সেক্টর ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ কোর্স বর্জন এবং তাকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে প্রত্যাহারের আবেদন করেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ১০ সেপ্টেম্বর জরুরি সভায় বসে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি। সভায় কোর্সটি অন্য একজন শিক্ষকের কাছে দেওয়ার পাশাপাশি রিফা তাসফিয়ার তত্ত্বাবধানে থাকা টার্ম পেপারের শিক্ষার্থীদেরও অন্য শিক্ষকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে তার একাডেমিক দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের আবেদনটি তখন প্রশাসনের কাছে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি।
পরবর্তীতে বিভাগের উইকেন্ড প্রোগ্রামেও তার পাঠদান ও আচরণ নিয়ে অভিযোগ ওঠে। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর উইকেন্ড প্রোগ্রামের ২৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা কোর্স শিক্ষক পরিবর্তনের আবেদন করেন।
এ বিষয়ে ২৪ ডিসেম্বর উইকেন্ড প্রোগ্রামের সমন্বয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় রিফা তাসফিয়াকে উপস্থিত হয়ে তার বক্তব্য তুলে ধরার জন্য বলা হলেও তিনি উপস্থিত হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পরবর্তী ব্যাচগুলোতে তাকে উইকেন্ড প্রোগ্রামে পাঠদানের দায়িত্ব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে পাঠদানে আরও মনোযোগী ও নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটিও এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে।
এ ছাড়া তার পাঠদান কার্যক্রম নিয়েও বিভাগীয় পর্যায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। গত ১৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিভাগের ১৫০তম একাডেমিক কমিটির সভায় তার নেওয়া কয়েকটি কোর্সের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।
বিভাগের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, তৃতীয় বর্ষের দুটি কোর্সে পাঁচ মাস পার হলেও কোনো টিউটোরিয়াল পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি ঈদুল ফিতরের ছুটির পর ২৯ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি কোনো ক্লাস নেননি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চতুর্থ বর্ষের একটি কোর্সের একাডেমিক কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিয়েও সভায় অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
রিফা তাসফিয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির সভার ই-মেইল নোটিশের জবাবে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগও রয়েছে। বিভাগের ১৪৯তম একাডেমিক কমিটির সভার নোটিশের জবাবে তিনি শিক্ষকদের উদ্দেশে লেখেন, ‘টু অ্যাকাডেমিক কমিটি মিটিংস উইদিন লেস দ্যান ওয়ান মান্থ! ডিপার্টমেন্ট অন ফাস্ট ট্র্যাক টু সাকসেস (একমাসেরও কম সময়ে অ্যাকােডেমিক কমিটির দুটি সভা। সফলতার দিকে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে বিভাগ)’। বিভাগের শিক্ষকদের কাছে মন্তব্যটি আপত্তিকর মনে হওয়ায় তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে লিখিত বক্তব্য দেওয়ার জন্য ১২ মে পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি কোনো জবাব দেননি বলে বিভাগীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত বিভাগের ১৫১তম একাডেমিক কমিটির সভায় বিষয়টি আবারও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। সভায় শিক্ষকদের কেউ কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাকে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন। অন্যরা বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরে এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দেন।
সভায় শেষবারের মতো রিফা তাসফিয়ার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ দায়িত্ব দেওয়া হয় অধ্যাপক মো. নুরুল আমিনকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি রিফা তাসফিয়ার বাবার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও পরে আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এরপর বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক হরে কৃষ্ণ কুন্ড গত ১৮ জুন উপাচার্যের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠিয়ে বিষয়টিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
অভিযোগের বিষয়ে প্রভাষক রিফা তাসফিয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অন্য একটি গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে কিছু জানি না। আমাকে অফিসিয়ালি কিছু জানানো হয়নি যে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বা কিছু।’
এদিকে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মো. শামছুল আলম বলেন, ‘লোক প্রশাসন বিভাগের প্রভাষক রিফা তাসফিয়ার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে, তা তদন্ত করতে আজই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি জানান, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক খন্দকার মোহাম্মদ শরিফুল হুদাকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক তমালিকা সুলতানা এবং দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মোস্তফা নাজমুল মানসুর। লুৎফর রহমান আরিফ সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।
তদন্ত কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক শামছুল আলম।


