রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সেই সঙ্গে হামলায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
সোমবার টিআইবির পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর সহিংসতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের নিজ নিজ দল ও অঙ্গসংগঠনে সংস্কার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে টিআইবি।
রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান করা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড ধারণ করতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় আগামীর সময়ের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আরিফ উজ্জামান কোরবান এবং দৈনিক সমকালের প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজুসহ অন্তত ১০ সাংবাদিক আহত হন।
হামলার শিকার সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বিবৃতিতে বলেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারী, তাদের সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিতের পাশাপাশি সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে পুলিশের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির সুযোগ সংকুচিত করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনার প্রতিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহায়ত্ব এবং পুলিশের ব্যর্থতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, কেবল হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনলেই এ ধরনের সমস্যার সমাধান হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে আমূল সংস্কার ও আত্মশুদ্ধিও প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অঙ্গসংগঠনের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মুক্ত গণমাধ্যম, বাকস্বাধীনতা, ভিন্নমতের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের সমঅধিকার আরও হুমকির মুখে পড়বে।
বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, শুধু তদন্ত কমিটি গঠন বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। সহিংসতার প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে এবং অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, দলীয় সিদ্ধান্ত ও আচরণে গণতান্ত্রিক চর্চা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তা না হলে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই মন্তব্য করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উপাচার্য ও শিক্ষকদের পদত্যাগের দাবি, ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, দখলবাজি এবং পেশিশক্তির প্রদর্শনের ঘটনাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার চাওয়া এবং শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানোর অধিকার অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে। উপাচার্য বা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নিয়মতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তবে দাবি আদায়ে দলীয় প্রভাব, ভয়ভীতি বা বলপ্রয়োগ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
টিআইবির মতে, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হবে আইন ও বিধি অনুযায়ী, কোনো দলীয় শক্তির প্রভাবে নয়। সংস্থাটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করে দায় নির্ধারণেরও দাবি জানিয়েছে।
সংস্থাটির ভাষায়, রাজনৈতিক চাপ বা অসহায়ত্বের কথা বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক পরিচয় যেন অপরাধের সুরক্ষাকবচ না হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো যেন দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালন করতে পারে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।


