এ বছরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, জটিল ও সহিংস রূপ ধারণ করেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাসজুড়ে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এমএসএফ-এর মাসিক মনিটরিং প্রতিবেদনে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে নির্বাচনী সহিংসতার ৬৪টি ঘটনায় ৪ জন নিহত এবং ৫০৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে শেরপুরে জামায়াত নেতা রেজাউল করিমকে নৃশংসভাবে হত্যা এবং কিশোরগঞ্জে বিএনপি নেতা কামাল উদ্দিনের মৃত্যু উল্লেখযোগ্য।
মাসিক মনিটরিং প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক সহিংসতার আরও ২৪টি ঘটনায় ২১৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এই মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ২ জনের মৃত্যু এবং কারাগারে ১৫ জন বন্দির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা গত ডিসেম্বরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বিশেষ করে, রংপুর ও চুয়াডাঙ্গায় পুলিশ ও সেনা হেফাজতে দুই ব্যক্তির মৃত্যু এবং কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ জনমনে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। মেহেরপুর কারাগারে এক কয়েদিকে চোখ বেঁধে দফায় দফায় মারধরের অভিযোগ উঠেছে কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে, যা কারাগারের ভেতরে মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র ফুটিয়ে তোলে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।
আইনি প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা ও গণমামলার প্রবণতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারিতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও গণমামলার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। সরকার পতনের পর বিভিন্ন মামলায় আসামির সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে; জানুয়ারিতে নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ১২০ এবং অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা ৩২০-এ দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযানে জানুয়ারি মাসে ২২ হাজার ৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নারী, শিশু ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সংকট নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা এ মাসে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মোট ২৫৭টি নির্যাতনের ঘটনার মধ্যে ৩৪টি ধর্ষণ, ১১টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ৩টি ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫ জন প্রতিবন্ধী নারী ও শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
অন্যদিকে, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২৭ জন সাংবাদিক নানাভাবে হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৩ জন সাংবাদিক আইনি হয়রানির সম্মুখীন হয়েছেন। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ব্যবহার করে ভিন্নমত দমনের প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে এক মাসে ৪টি নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সীমান্ত ও সংখ্যালঘু পরিস্থিতি সীমান্ত পরিস্থিতিও ছিল উদ্বেগজনক। জানুয়ারিতে বিএসএফ-এর গুলিতে ১ জন আহত এবং তাদের নির্যাতনে ১ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ভারতীয় কোস্ট গার্ড কর্তৃক ২৪ জন জেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ১৫টি ঘটনা ঘটেছে, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য হুমকি স্বরূপ।
এমএসএফ-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল এই পরিস্থিতির উত্তরণে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত, বিচারহীনতার অবসান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংস্কার এবং নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।


