দেশের অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য সামনে রেখে প্রস্তাবিত বাজেটকে জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব ও বিনিয়োগ সহায়ক হিসেবে অভিহিত করেছে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণে নেওয়া উদ্যোগগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
বৃহস্পতিবার চিটাগাং চেম্বারের বাজেট প্রতিক্রিয়া অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
চেম্বার নেতারা বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার এমন একটি বাজেট দিয়েছে, যেখানে একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর কর ও ভ্যাটের চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তারা এ বাজেটকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দেন।
নেতারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন নীতিমালা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনবে। পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার কমানোর পরিকল্পনাকেও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও আবাসন সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, এতে শিল্পায়ন ও বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়বে।
চলতি অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ উৎসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে চেম্বার।
চেম্বারের নেতারা বলেন, ব্যক্তি করদাতাদের টার্নওভার করের আওতামুক্ত সীমা ৩ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা এবং ব্যাংক স্থিতির ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক অব্যাহতির সীমা ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা করায় সাধারণ মানুষ ব্যাংকে অর্থ জমা রাখতে উৎসাহিত হবেন।
এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি, ফ্যামিলি কার্ডে সহায়তা বৃদ্ধি, কৃষিঋণ মওকুফ, তরুণ উদ্যোক্তাদের জামানত ছাড়া ঋণ এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহীদের জন্য ঋণ সুবিধাকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
কর্পোরেট কর কাঠামো সহজ ও স্থিতিশীল রাখাকে স্বাগত জানিয়ে ব্যবসায়ীরা বলেন, অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল সহজ করা এবং ব্যবসার অনুমোদনযোগ্য ব্যয় বাড়ানো বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করহার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করায় শিক্ষা খাতে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে বলেও তারা মনে করেন।
একই সঙ্গে বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক কমানো, শিশু খাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে সুবিধা, খেজুর ও মসলাজাত পণ্যে রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার এবং পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্যখাতের কাঁচামালে রেয়াতি সুবিধা দেওয়ায় বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন বক্তারা।
জ্বালানি সক্ষমতা বাড়াতে সৌর প্যানেল, লিথিয়াম ব্যাটারি ও সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রণোদনাকে ভবিষ্যতমুখী সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি ইলেকট্রিক যানবাহন আমদানিতে অগ্রিম আয়কর কমানোর ফলে পরিবেশবান্ধব শিল্প বিকাশ ত্বরান্বিত হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
তারা আরও বলেন, ক্যানসার ও কিডনি রোগের চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর ছাড় দেওয়ায় সাধারণ রোগীরা উপকৃত হবেন।
আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতে কর অব্যাহতি, কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় করমুক্ত রাখা, স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য করার সিদ্ধান্তকে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে চেম্বার।
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে অফডক, আইসিডি, লজিস্টিকস ও বেসরকারি টার্মিনাল অপারেটরদের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগকে বন্দরকেন্দ্রিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন বক্তারা।
চিটাগাং চেম্বারের বাজেট প্রতিক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলেন চেম্বারের সাবেক সভাপতি আলী আহমেদ, আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, বর্তমান সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. আমজাদ হোসেন চৌধুরী, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ মসিউল আলম স্বপন, পরিচালক কামাল মোস্তফা চৌধুরী, আমান উল্লা আল ছগির (ছুট্টু), মোহাম্মদ আকতার পারভেজ, মোহাম্মদ মনির উদ্দিন, মো. জাহিদুল হাসান, আসাদ ইফতেখার, এএসএম ইসমাইল খান, মো. আলাউদ্দিন আল আজাদ, মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, সরোয়ার আলম খান, শহীদুল আলম, মোহাম্মদ শফিউল আলম ও মো. সেলিম নুর।
বিশেষ আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর এসএম নসরুল কাদির, চট্টগ্রাম ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. সোলায়মান, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান (সাগর), আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দিন, সীকম গ্রুপের সিএফও গোলাম কিবরিয়া, অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ফার্ম বাসু ব্যানার্জি নাথ অ্যান্ড কোং এর জিসি পাল, এমএম রহমান অ্যান্ড কোং এর সিদ্ধার্থ বড়ুয়া, মো. সবুজ অ্যান্ড কোং এর মোদাচ্ছার আহমেদ সিদ্দিকী, সানম্যান গ্রুপের আরশাদ উল্লাহ, জে এফ লিমিটেডের মনোয়ারুল হক, এমআরএইচ দে অ্যান্ড কোম্পানি সমুন চন্দ্র দে, কবির গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ এর মো. নুরুল হুদা সিদ্দিকী, এসএফ আহমেদ অ্যান্ড কোং এর মোহামিন আতিক চৌধুরী, জেনারেল সিকিউরিটিজের সাজ্জাদুল আলম চৌধুরী, চট্টগ্রাম লজিস্টিক্সের এনামুল হক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।


