জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে ব্যবসা না করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘জুলাই কারও একার নয়। জুলাইয়ের চেতনা দিয়ে কেউ ব্যবসা করবেন না। শুধু জুলাইয়ের চেতনা বিক্রি করে দীর্ঘদিন রাজনীতি করা যাবে না।’
রোববার বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। সভায় সভাপতিত্ব করেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অর্জন ছিল দীর্ঘ আন্দোলন, ত্যাগ ও রক্তদানের সম্মিলিত ফল। এ অর্জনকে দলীয় মালিকানার বিষয় বানানো কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত নয়। একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য অটুট রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বিচার বিভাগ এখন কেবল স্বাধীনই নয়, সার্বভৌমত্বের কাছাকাছি রয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, বিচার বিভাগেরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা প্রয়োজন। তবে উচ্চ ও নিম্ন আদালতের কিছু বিচারক অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়িত্ব পালন করায় সমাজে এখনো অবিচার ও অস্থিরতার প্রভাব রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর নির্যাতন, রাজনৈতিক মামলায় বিরোধীদের সাজা দেওয়া কিংবা বিতর্কিত নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার ঘটনায় বিচার বিভাগের একটি অংশেরও ভূমিকা ছিল। তাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের সংস্কার জরুরি।
রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কারের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সাংবিধানিক ও আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধিকাংশ অধ্যাদেশ ইতোমধ্যে আইনে পরিণত করা হয়েছে। তবে স্থায়ী সংস্কারের জন্য সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য।
এ লক্ষ্যে একটি সাংবিধানিক সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, বিচারক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়ে প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনার জবাবে মন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ না নিয়ে পরে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা গ্রহণযোগ্য নয়। আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর সংস্কারই সরকার বাস্তবায়ন করতে চায়।
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যে গণভোটের বিধান রয়েছে, তা নির্দিষ্ট কিছু সাংবিধানিক সংশোধনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সম্প্রতি যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেটি সাংবিধানিক গণভোট ছিল না; বরং একটি রাষ্ট্রপতির আদেশের ভিত্তিতে হয়েছে, যার আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার দাবি, জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য একটি প্রশ্নভিত্তিক গণভোট হওয়া উচিত ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত বিভিন্ন কমিশনের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছু কমিশন বাস্তব প্রয়োজনের চেয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কমিশন নয়, কার্যকর আইন প্রয়োজন। সে কারণে সরকার ‘গুম প্রতিরোধ আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে গুমের বিভিন্ন সংজ্ঞা, শাস্তি, বিচারিক এখতিয়ার ও বিচারপ্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে।
মানবাধিকার আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিধান আইন হিসেবে গ্রহণ করা হবে না।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এটি কোনো এক ব্যক্তি বা একক রাজনৈতিক শক্তির অর্জন নয়। দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন, অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই ৫ আগস্টের পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, আন্দোলনের সামনের সারির পাশাপাশি নেপথ্যেও অনেকে ভূমিকা রেখেছেন। তবে সেই অবদান নিয়ে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে সামনে রাখতে হবে।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনার ওপর ভর করে কেউ দীর্ঘদিন রাজনীতি করতে পারবে না। যারা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলছেন, তাদের জনগণের সামনে সেই রাজনৈতিক দর্শন স্পষ্ট করতে হবে। শুধু স্লোগান বা আবেগ দিয়ে রাজনীতি টিকে থাকে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য দুর্বল হলে স্বৈরাচারের ফিরে আসার পথ তৈরি হবে। তাই মতভেদ থাকলেও জাতীয় প্রশ্নে সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্র গড়াই এখন সবার প্রধান দায়িত্ব।
আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক নাসির উদ্দিন আহমেদ এবং গণঅধিকার পরিষদ ও ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।


