ঈদুল আজহার ছুটি ঘিরে চট্টগ্রামের বেসরকারি অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোগুলোতে রপ্তানি পণ্যের নজিরবিহীন জট তৈরি হয়েছে। এতে প্রায় ছয় হাজার কাভার্ড ভ্যান দিনের পর দিন ডিপোতে আটকা থাকায় রপ্তানিকারকদের পরিবহন ব্যয় হঠাৎ করেই দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে।
মূলত এসব কাভার্ড ভ্যানের সাহায্যে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্য পরিবহন করা হয়ে থাকে। এসব যানবাহনের দীর্ঘ সারি কয়েক দিন ধরে বেসরকারি ডিপোগুলোর বাইরে অপেক্ষা করছে। পণ্য খালাস করতে কোথাও তিন থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দীর্ঘ ঈদ ছুটির আগে অগ্রিম রপ্তানি চালান শেষ করতে গিয়ে রপ্তানিকারকেরা হুড়োহুড়ি করে পণ্য পাঠানোয় দেশের রপ্তানি সরবরাহব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবহন ভাড়া এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে ডিপোতে জট এবং জাহাজ ভেড়াতে বিলম্ব হওয়ায় রপ্তানি চালান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
ডিপোগুলোতে জায়গার সংকট তৈরি হওয়ায় রপ্তানি পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যান ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে হাজার হাজার যানবাহন আশপাশের সড়কে আটকা পড়ে আছে। পরিবহন খাতের নেতাদের হিসাবে, বর্তমানে পাঁচ থেকে ছয় হাজার ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ডিপো এবং আশপাশের এলাকায় আটকা রয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো সমিতির তথ্যমতে, চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি ডিপোতে সাধারণত প্রায় আট হাজার একক কনটেইনার ধারণক্ষমতার রপ্তানি কনটেইনার থাকে। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৫ হাজারে পৌঁছেছে, যা স্বাভাবিক চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।
পণ্য পরিবহন খাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণ সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার কাভার্ড ভ্যান ডিপো, খাতুনগঞ্জ, কারখানা ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে পণ্য পরিবহন করে। কিন্তু এর প্রায় অর্ধেক যানবাহন এখন ডিপোতে আটকে থাকায় পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবহন সংকট তৈরি হয়েছে।
এই সংকটের কারণে পরিবহন ভাড়াও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আগে যে রুটে প্রতি ট্রিপে ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা ভাড়া লাগত, এখন সেখানে ৪০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির পরিচালক এবং এশিয়ান গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ আহমেদ সালাম বলেন, ‘১০ থেকে ১১ দিনের ঈদ ছুটি বিবেচনায় রেখে রপ্তানিকারকেরা আগামী দুই সপ্তাহের চালান আগেভাগেই পাঠিয়ে দিয়েছেন। প্রতি বছরই ঈদের আগে কারখানাগুলো ছুটির সময় রপ্তানি ব্যাহত এড়াতে ডিপোতে পণ্য পাঠায়। কিন্তু এবার খালাস ও হ্যান্ডলিং কার্যক্রম স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় নিচ্ছে। ফলে কাভার্ড ভ্যানগুলো দিনের পর দিন আটকা পড়ে আছে।’
তার মতে, ডিপোগুলোতে অতিরিক্ত রপ্তানি কনটেইনার, জনবল সংকট, জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে বিলম্ব এবং বন্দরের জট- সব মিলিয়ে পুরো রপ্তানি শৃঙ্খলে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক কারখানা ঈদের পরের চালানও আগেভাগে পাঠিয়ে দিয়েছে। এতে আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা ডিপোগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। প্রতি ঈদের আগেই এমন সমস্যা দেখা দেয়। তবে এবার পরিস্থিতি পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।’
সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রপ্তানি পণ্য জাহাজে তোলার আগে সেগুলো প্রথমে বেসরকারি ডিপোতে নেওয়া হয়। সেখানে জাহাজের সময়সূচি অনুযায়ী কনটেইনারে পণ্য ভর্তি করা হয়। একই সঙ্গে ডিপোগুলো ৬৫ ধরনের আমদানিপণ্য খালাস ও খালি কনটেইনার সংরক্ষণের কাজও করে।
তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো সমিতির নেতারা বলছেন, ঈদের আগে রপ্তানিকারকেরা একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য পাঠানোয় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
তাদের মতে, ঈদের সময় কারখানা বন্ধের আগে মালিকেরা নিয়মিতভাবেই আগাম রপ্তানি পণ্য পাঠান। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে ডিপোগুলোকে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হয়।
সমিতির এক কর্মকর্তার দাবি, রপ্তানিকারকেরা যদি একবারে না পাঠিয়ে ধাপে ধাপে পণ্য পাঠাতেন, তাহলে এমন পরিস্থিতি এড়ানো যেত।

তীব্র এই যানজট পরিবহন শ্রমিকদের জীবনেও দুর্ভোগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমেদ বলেন, ‘হাজার হাজার যানবাহন কয়েক দিন ধরে অলস বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। প্রতিটি যানবাহনকে ডিপো ও আশপাশের সড়কে তিন থেকে চার দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। চালক ও সহকারীরা অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।’
পণ্য খালাসের অনুমতির অপেক্ষায় চালকেরা পতেঙ্গা আউটার রিং রোড, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও টোল রোড এলাকায় রাত কাটাচ্ছেন। পরিবহন মালিকদের অভিযোগ, আমদানিপণ্য সময়মতো ডিপো থেকে সরানো হচ্ছে না। ফলে ডিপো ইয়ার্ডগুলো কার্যত গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা রপ্তানি পণ্যবাহী যানবাহনের জট আরও বাড়িয়ে তুলছে।
পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক চালক ঈদের সময়ও পরিবারের কাছে যেতে পারছেন না।
এদিকে ২৫ মে থেকে শুরু হওয়া সাত দিনের সরকারি ছুটির মধ্যেও রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রম সচল রাখতে চট্টগ্রাম বন্দর, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস এবং ২১টি বেসরকারি ডিপো সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ আল আমিন বলেন, ‘ঈদের ছুটির পুরো সময়জুড়েই প্রয়োজনীয় জনবল দিয়ে কাস্টমস কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। আমদানিপণ্য খালাস ও রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণসহ সব কার্যক্রম ঈদের ছুটিতেও চলমান রয়েছে।’
ঈদ ঘিরে বন্দর কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও তিনটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে।
বন্দর কর্মকর্তাদের মতে, একটি দল বহির্নোঙরে পণ্য খালাস তদারকি করবে, আরেকটি দল জেটি ও ইয়ার্ডে কনটেইনার চলাচল পর্যবেক্ষণ করবে এবং তৃতীয় দল বন্দরের জলসীমার নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্ব পালন করবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ মে পর্যন্ত বন্দরের বহির্নোঙর ও জেটিতে মোট ৭৯টি সচল জাহাজ অবস্থান করছিল। এর মধ্যে ১৬টি কনটেইনার ও বাল্ক কার্গোবাহী জাহাজ মূল জেটিতে ছিল। এ ছাড়া সাধারণ পণ্য, খাদ্যশস্য, সার, সিমেন্ট ক্লিংকার, চিনি ও তেলবাহী ৫৯টি জাহাজ বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ ছিল। আরও চারটি জাহাজ সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং সুবিধাসহ অন্য বার্থে অবস্থান করছিল।


