দেয়ালে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষের পর চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ক্যাম্পাসে নতুন করে সহিংসতা এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশ ও কলেজ কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক উত্তেজনাকে ঘিরে পুরো এলাকা এখনো থমথমে, যদিও পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে সাময়িকভাবে কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি প্রায় ছিল না বললেই চলে।
জানা গেছে, কলেজ কর্তৃপক্ষের নিজস্ব উদ্যোগে সংঘর্ষের কারণ উৎঘাটনে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তিনজন সদস্য নিয়ে গঠিত এই কমিটিকে বুধবার থেকে সাত দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার সময় দেওয়া হয়েছে।
কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর জসীম উদ্দিন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, কে কার বিরুদ্ধে মামলা করবে এটা তাদের রাজনৈতিক বিষয়। তাদের সিনিয়র নেতারা আছেন, তারা তাদের মতো করে বিষয়টি চিন্তা করবেন। আমাদের কলেজ প্রশাসনের এতে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
শনিবার থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্স প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শুরু হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দিতে পারে, সেজন্য আমাদের ‘ভিজিল্যান্স টিম’ থাকবে যাতে বহিরাগত কেউ ক্যাম্পাসে ঢুকতে না পারে। যদি নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তবে আগামী রোববার থেকে নিয়মিত ক্লাস শুরু করার পরিকল্পনা আমাদের আছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে শিক্ষকরা সবাই মিলে ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন।’
সংঘর্ষের পর থেকেই ক্যাম্পাসের ভেতর ও আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রবেশপথগুলোতে কড়াকড়ি নজরদারি রাখা হচ্ছে এবং সন্দেহজনক চলাচলের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তারা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছেন।
সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মোহাম্মদ মাহফুজ হাসান সিদ্দিকী বলেন, বিষয়টি কমিশনার স্যার সরাসরি তদারকি করছেন। যেকোনো ধরনের সংঘাত এড়াতে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।
মঙ্গলবারের সহিংসতায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে কাজ চলছে জানিয়ে পুলিশ বলেছে, এখনো কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের না করলেও উভয় পক্ষই মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে দ্রুত মামলা দায়েরের কথা জানানো হয়েছে।
নগর দক্ষিণ ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক জাহিদুল আলম জয় বলেন, এখনো মামলা করিনি, তবে অবশ্যই মামলা করা হবে।
অন্যদিকে ছাত্রদলের নেতারাও জানিয়েছেন, প্রতিপক্ষ মামলা করলে তারাও পাল্টা মামলা করবেন। এতে করে পরিস্থিতি নতুন করে জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত সোমবার দেয়ালে লেখা ছাত্র শব্দ মুছে ‘গুপ্ত’ শব্দ লিখাকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও বিষয়টি দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নেয়। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, পরে ব্যানার ছেঁড়া এবং অভিযোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত তা দফায় দফায় সংঘর্ষে রূপ নেয়, যেখানে লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটে।
ঘটনার পর উভয় ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারাও চট্টগ্রামে এসে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। ডাকসুর ভিপি ও ছাত্রশিবির নেতা সাদিক কায়েম আহত কর্মীদের দেখতে গিয়ে বলেন, হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি এ ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি দাবি করে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর কাছে স্মারকলিপিও দেন।
অন্যদিকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বিক্ষোভ সমাবেশে বলেন, তারা প্রকাশ্যে রাজনীতি করেন, কিন্তু প্রতিপক্ষ গোপনে হামলা চালিয়ে নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। তিনি সহিংসতা পরিহার করে মতপার্থক্য সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানান।
বর্তমানে ক্যাম্পাসে বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষ না থাকলেও অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি। বিশেষ করে কলেজ খোলার পর শিক্ষার্থীরা ফের ক্যাম্পাসে ফিরলে আবারও মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু পুলিশ মোতায়েন দিয়ে পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। এজন্য প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ, দ্রুত তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সংলাপও প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক অবস্থান আপাতত সহিংসতা ঠেকাতে ভূমিকা রাখলেও টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। অন্যথায় সামান্য উসকানিতেই আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ক্যাম্পাস।


