চট্টগ্রাম বন্দরের কাস্টমসে পণ্য ছাড় ও কার্গো প্রক্রিয়াকরণে সময় লাগছে ১০ থেকে ১২ দিন। অস্বাভাবিক এই দেরির কারণে ব্যবসায়ীদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি চার্জ, পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় জট তৈরি হচ্ছে, কমে যাচ্ছে উৎপাদনশীলতা। সবমিলিয়ে বেড়ে যাচ্ছে পণ্যের দাম।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিচালন ব্যবস্থা আধুনিক হওয়ায় এখন একটি জাহাজ দ্রুত বন্দরে ভিড়তে পারে। দু-তিন দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে বন্দর ত্যাগও করতে পারে। কিন্তু কাস্টমস থেকে পণ্য ছাড় করার প্রক্রিয়া শুরু হলেই সব বন্দরের কার্যক্ষমতা ভেঙে পড়ে। এমন পরিস্থিতিকে বাণিজ্য প্রতিযোগিতার বড় বাধা বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেছন, সমস্যাটি এখন জেটিতে নয়, বরং কাস্টমসের ছাড়করণ প্রক্রিয়ায়। তিনি আরও জানান, নথিপত্র তৈরি, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং পুরোনো ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা এখনো কন্টেইনার ছাড়তে দেরি করছে। কন্টেইনার একবার বন্দরের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে গেলে কাস্টমস এবং অন্যান্য সংস্থাই এর গতি নির্ধারণ করে বলে জানান সিপিএ চেয়ারম্যান।
বন্দরের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষের মতে, পণ্য ছাড়করণের এই ধীর গতির মূল কারণ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের পরিদর্শনে অসংগতি, অতিরিক্ত নথিপত্র ও ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে সকল কাজ করা।
দেশের অন্যতম বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান টি কে গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক জাফর আলম বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টমসের প্রক্রিয়া বিশ্বের অন্যতম জটিল ও সময়সাপেক্ষ। তিনি মনে করেন, মাঠ পর্যায়ে এই প্রক্রিয়া এখনো আন্তর্জাতিক মান থেকে অনেক পিছিয়ে আছে।
রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র পরিচালক ফয়সাল সামাদ অভিযোগ করেন, স্বয়ংক্রিয় কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু না হওয়ায় আমদানি করা পণ্য সময়মতো খালাস হচ্ছে না। এ কারণে অনেক সময় রপ্তানিকারকদের বাধ্য হয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) কন্টেইনারগুলো বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অংশ হিসেবে কারখানার ভেতরেই শুল্ক ছাড়করণ ও শারীরিক পরিদর্শনের সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু কাস্টমস কর্মকর্তারা প্রায়শই এই বিধান মানছেন না।
তবে চট্টগ্রাম কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার এইচ এম কবির বলেন, প্রকৃত রাজস্ব নিশ্চিত করার জন্যই এই ছাড়করণ প্রক্রিয়া দরকার। তিনি জানান, আন্ডার-ইনভয়েসিং, চোরাচালান এবং রাজস্ব ক্ষতি এড়ানোর জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সত্যতা যাচাইয়ে কিছুটা সময় লাগে।
এইচ এম কবির বলেন, শুল্ক মূল্যায়নের ৭০ ভাগ সময়ই পরীক্ষা ও রিপোর্ট সংগ্রহ করতে চলে যায়। অবশ্য ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো এখন পণ্য ছাড়করণের সময় কমাতে সাহায্য করছে বলেও জানান তিনি। কাস্টমসের এই ডেপুটি কমিশনার বিশ্বাস করেন, বিশ্ব শুল্ক সংস্থার সংশোধিত কিওটো কনভেনশনের (আরকেসি) পূর্ণ বাস্তবায়ন এই বিলম্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
২০২২ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক গবেষণায় দেখা যায়, পণ্যের ঘোষণা দাখিল থেকে শুরু করে পরিদর্শন এবং চূড়ান্ত ছাড়করণ পর্যন্ত কাস্টমসের প্রক্রিয়াগুলো শেষ হতে গড়ে সাড়ে ১১ দিন সময় লাগে, যা আঞ্চলিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি।
ব্যবসায়ীরা জানান, এই বিলম্বের ফলে খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। একটি জাহাজ জেটিতে অপেক্ষারত থাকার জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার ডলার চার্টার ফি দিতে হয়। কন্টেইনার খালাস হওয়ার পর স্টোরেজ চার্জ জমতে শুরু করে। ২০ ফুট কন্টেইনারের জন্য চার দিন ফ্রি থাকার পর প্রতিদিন ৬ ডলার, সাত দিনের পর প্রতিদিন ১২ ডলার এবং ২১ দিনের পর প্রতিদিন ২৪ ডলার চার্জ দিতে হয়। আর ৪০ ফুট কন্টেইনারের চার্জ এর দ্বিগুণ।
বিশ্বব্যাংকের একটি মূল্যায়ন অনুযায়ী, কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতার কারণে সৃষ্ট এই অতিরিক্ত খরচ সরাসরি ভোক্তাদের পণ্যের দামে যুক্ত হয়। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারস অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সহসভাপতি খায়রুল আলম বলেন, প্রতিটি অতিরিক্ত দিনের অর্থ ইয়ার্ড ভাড়া, ট্রাক অপেক্ষার খরচ এবং ব্যাংক সুদ বৃদ্ধি। একদিনের জন্য ছাড়করণ বন্ধ হলে এক সপ্তাহের জট তৈরি হয়। একজন ব্যবসায়ী বলেন, বন্দরে একটি কন্টেইনার অতিরিক্ত একদিন থাকার অর্থ হচ্ছে প্রতিটি পরিবারের ওপর লুকানো কর।
নিরবচ্ছিন্ন ছাড়করণের জন্য নিট গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ছুটির দিনগুলোতেও অন্তত সীমিত আকারে বন্দর কার্যক্রম খোলা রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, বৃহস্পতিবার অফিস সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ না হলে অনেক সময় রোববার পর্যন্ত পণ্য খালাস করা যায় না।
বিশ্ব শুল্ক সংস্থার সংশোধিত কিওটো কনভেনশন (আরকেসি) একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো, যা বিশ্ব বাণিজ্যের সুবিধার্থে শুল্ক প্রক্রিয়াকে মানসম্মত ও সহজ করে। আধুনিক ও দক্ষ শুল্ক প্রশাসনের জন্য এটি স্বচ্ছতা, পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং ঝুঁকি-ভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে উৎসাহিত করে। বাংলাদেশ ২০১২ সালে এই কনভেনশনে যোগ দিয়ে ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করে। কিন্তু আইন সংস্কারের স্থবিরতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ের কারণে ২০২৫ সালেও একটি কার্যকর ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো এবং অভিন্ন ঝুঁকি-ভিত্তিক পরিদর্শনের মতো মূল শর্তগুলো এখনো পূরণ হয়নি।
এনবিআর-এর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্বীকার করেন, দেশ এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অনেক পিছিয়ে আছে। ২০২৫ সালের শেষের জন্য সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করাও কঠিন হতে পারে।
খায়রুল আলমসহ ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বাংলাদেশের এখন পূর্ব-নির্ধারিত পরিসেবা-স্তর চুক্তি, পণ্য আসার আগেই কার্যকর প্রক্রিয়াকরণ, একটি কার্যকর সিঙ্গেল উইন্ডো এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য আপিল ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। খায়রুল আলম বলেন, এগুলো কোনো বড় ধরনের সংস্কার নয়—এগুলো সংশোধিত কিওটো কনভেনশনের মূলনীতি।
এদিকে, দেশের ৯২ শতাংশ বিদেশি বাণিজ্য সামলানো চট্টগ্রাম বন্দর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে। এখানে টার্মিনাল অপারেশন সিস্টেম চালু হয়েছে, রেড সি গেটওয়ের মতো আন্তর্জাতিক পেশাদার অপারেটরদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সিপিএ কর্মকর্তারা জানান, এই সংস্কারের ফলে নিউ মুরিং টার্মিনালে দৈনিক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ৩০ শতাংশ বেড়ে আড়াই হাজার টিইইউ থেকে সাড়ে তিন হাজার টিইইউ হয়েছে। জাহাজ টার্নঅ্যারাউন্ড সময় ৬১ ঘণ্টা থেকে কমে হয়েছে ৫৭ ঘণ্টা। এ ছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে সকল কাজ সম্পূর্ণরূপে কাগজবিহীন করারও পরিকল্পনাও করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।


