ফুটবল দুনিয়ায় একের পর এক রূপকথা লিখে চলা লিওনেল মেসি এবার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এক রেকর্ডের শিখরে পা রেখেছেন। ফুটবলের মহাবৈশ্বিক আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার পাশে যৌথভাবে নিজের নাম খোদাই করেছেন আর্জেন্টিনার এই কিংবদন্তি অধিনায়ক। বিশ্বকাপের মঞ্চে তার গোল সংখ্যা এখন ১৬। আর মাত্র একটি গোল করলেই ফুটবল ইতিহাসের সব কীর্তিকে পেছনে ফেলে বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুটের একক মালিক হবেন এই ফুটবল জাদুকর।
অবশ্য মেসির ঘাড়েই নিঃশ্বাস ফেলছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। তিনিও নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে গেছেন ১৪ তে। মেসি কিংবা এমবাপ্পে, যে কেউ এবারই ভেঙে ফেলতে পারেন ক্লোসার রেকর্ড।
বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে গোল করার সামর্থ্য দিয়ে যারা অমর হয়ে আছেন, তাদের শীর্ষ তালিকাটি ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য এক পরম আরাধ্য উপাখ্যান। এই তালিকায় ২৪ ম্যাচ খেলে ১৬ গোল করে এতদিন শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছিলেন জার্মানির স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসা। তার সঙ্গে এবার মেসির নাম বসলো।
তাদের ঠিক পরেই ১৫ গোল নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন ব্রাজিলের ‘ফেনোমেনন’ খ্যাত রোনালদো নাজারিও। এ ছাড়া ১৪টি করে গোল নিয়ে যৌথভাবে তৃতীয় অবস্থানে আছেন পশ্চিম জার্মানির কিংবদন্তি গার্ড মুলার এবং ফ্রান্সের বর্তমান তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে।

তালিকায় থাকা অন্যদের সঙ্গে মেসির তুলনায় একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট, আর তা হলো মাঠে তাদের পজিশন এবং খেলার ধরন। মিরোস্লাভ ক্লোসা, রোনালদো নাজারিও কিংবা গার্ড মুলার—তারা প্রত্যেকেই ছিলেন নিখুঁত ‘নাম্বার নাইন’ বা পেনাল্টি বক্সের চতুর স্ট্রাইকার। তাদের মূল কাজই ছিল গোল করা।
অন্যদিকে লিওনেল মেসি মূলত একজন প্লে-মেকার, উইঙ্গার এবং আক্রমণভাগের মূল নিয়ন্ত্রক। মেসি শুধু গোলই করেননি, বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট বা গোল করানোর কীর্তিও তার ঝুলিতে রয়েছে। সতীর্থদের দিয়ে গোল করানো এবং নিজে গোল করার এই দ্বৈত ভূমিকায় মেসি বাকিদের চেয়ে অনেক অনন্য।

মেসির এই যাত্রায় জড়িয়ে আছে দীর্ঘ দুই দশকের ধারাবাহিকতার মহাকাব্য। ২০০৬ সালে জার্মানির মাটিতে মাত্র ১৯ বছর বয়সে সার্বিয়ার বিপক্ষে গোল করে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসেও তা সমানভাবে প্রদীপ্ত।
এই রেকর্ডের মহিমা কেবল সংখ্যার ফ্রেমে বন্দি নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলে লিওনেল মেসির অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্বের এক নতুন দলিল। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছর পর সোনালী ট্রফি এনে দিয়ে তিনি ফুটবলের অধরা বৃত্তটি পূর্ণ করেছিলেন। অনেকেই ভেবেছিলেন সেটিই হয়তো তার শেষ বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট। কিন্তু ক্লাব ফুটবলের আঙিনা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তিনি এখনো সমানে লড়ে যাচ্ছেন।
ফুটবল বিশ্বে পেলের শৈল্পিকতা, ম্যারাডোনার ঈশ্বরদত্ত ক্ষিপ্রতা আর ক্রুইফের আধুনিক দর্শনের যে ধারা, তার সবটুকুর এক অপূর্ব সংমিশ্রণ লিওনেল মেসি। ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড তো আগেই ছিল, এবার গোলদাতার শীর্ষস্থানটি ছুঁয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন—ফুটবল খেলাটি যদি একটি শিল্প হয়, তবে মেসি তার সর্বকালের সেরা শিল্পী। এখন সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন সেই একটি ঐতিহাসিক গোলের জন্য, যা মেসিকে এককভাবে বসিয়ে দেবে এক অনন্য উচ্চতায়।


