জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকে মব সৃষ্টি করে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বের করে দেওয়ার যে নজির তৈরি হয়েছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পরও তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মবের মুখে পড়ে গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনার পর অবশেষে তিনি পদত্যাগ করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের কাছে বুধবার দেওয়া এক চিঠিতে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকে ঘটে যাওয়া মব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ওই দিন বিকেলে দাপ্তরিক গাড়িতে করে মিরপুর ডিওএইচএসে নিজ বাসভবনে ফিরে যান।
এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর গভর্নরের উপদেষ্টার মতো সম্মানজনক পদে দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে আর স্বাচ্ছন্দ্যকর নয় বলেও তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ দিন পর তার পদত্যাগ কার্যকর হবে। এই পদে তার মেয়াদ ২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নিয়মিত কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করার পর অবসরের পরও আহসান উল্লাহ একাধিকবার উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ আহসান এইচ মনসুর গভর্নর হওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংস্কার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য তাকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, তার কিছু প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়ে কর্মকর্তাদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে পদোন্নতিতে পরীক্ষাভিত্তিক পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ এবং কিছু পদে জনবল কমানোর প্রস্তাব বিতর্কের জন্ম দেয়।
এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে নতুন গভর্নর নিয়োগের দিন বাংলাদেশ ব্যাংকে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ওই দিন জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা আহসান উল্লাহকে ঘিরে ধরেন এবং তাকে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকে তিনি আর অফিসে যাননি। একই দিনে সরকার ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকে মবের ঘটনা এই প্রথম নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দুই দিন পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে মব সৃষ্টি করে ডেপুটি গভর্নর পদমর্যাদার তিন কর্মকর্তাকে কার্যত কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক মহিউদ্দিন রনিসহ শতাধিক বহিরাগত সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ওই ঘটনার পর একজন ডেপুটি গভর্নর অফিসে আসতেই পারেননি।
এই সময়ে আন্দোলনকারীদের চাপের মুখে দুজন ডেপুটি গভর্নরসহ একই পদমর্যাদার আরও দুই কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ডেপুটি গভর্নর কাজী ছাইদুর রহমান ও খুরশীদ আলম, পাশাপাশি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান মাসুদ বিশ্বাস এবং নীতি উপদেষ্টা আবু ফরাহ মো. নাছের। মাসুদ বিশ্বাস ও নাছের ডেপুটি গভর্নর মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এদের মধ্যে মাসুদ বিশ্বাস দুর্নীতির অভিযোগে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। আবু ফরাহ নাছের ও কাজী ছাইদুর রহমানের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করছে বিএফআইইউ ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ছাড়াই মবের মুখে পদত্যাগ করা খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে কোনো সংস্থাই অনিয়মের প্রমাণ পায়নি।
জানা গেছে, খুরশিদ আলমের নিয়মিত চাকরির মেয়াদ ছিল ২০২৬ সাল পর্যন্ত। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি আগের নিয়মিত পদ ছেড়ে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
এদিকে, বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন অর্থনীতিবিদ সাদিক আহমেদ। তিনি পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভাইস চেয়ারম্যান এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ছিলেন।


