গুম, গোপনে বন্দী ও নির্যাতনের অভিযোগে বাংলাদেশে ২৮ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ‘অনেক প্রতীক্ষার পরে এসেছে’ বলে মন্তব্য করেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
২০১৭ সালে গুম এবং গোপন বন্দীশালা নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কথা তুলে ধরে সংস্থাটি বলে, ‘তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হাস্যরস করে এটিকে ‘কাল্পনিক প্রচারণা’ বলে উড়িয়ে দেন।’
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলির ‘ন্যায়বিচারের পথে বাংলাদেশের আরেক ধাপ’ শিরোনামে লেখা একটি প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।
বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের প্রসঙ্গ টেনে প্রতিবেদনে তিনি লিখেছেন, ‘আমি যখন তার সাথে সাক্ষাৎ করি, তখন মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান অবজ্ঞা করে বলেছিলেন, “গুম হওয়া” বেশিরভাগ মানুষই অপরাধী, ঋণ খেলাপি বা ব্যভিচারী, তাদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছিল না। আমার অনুরোধে এ নিয়ে তদন্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু তা আর কখনোই হয়নি।’
২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত শেখ হাসিনা প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন আসাদুজ্জামান খান, প্রতিবেদনে বলা হয়, সেই সময় প্রবল স্বৈরাচারী হয়ে উঠছিলেন তিনি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন এবং বাক স্বাধীনতা দমন নিয়ে আমাদের কাজ বরাবর অস্বীকার করে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এই সময়ে।
২০২৪ সালের আগস্টে তিন সপ্তাহব্যাপী আন্দোলনের ফলে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত এসব দমন পীড়ন অব্যাহত ছিল। এরপরই শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খানসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
এরপর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। তারা গুমের ঘটনায় একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। যে কমিশন এরই মধ্যে ১ হাজার ৮৫০টি অভিযোগ গ্রহণ করেছে এবং ৩০০ জনের বেশি গুমের শিকার ব্যক্তি বন্দী অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেছে বলে জানিয়েছে। কমিশন সম্প্রতি “আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ(সত্য উন্মোচন)” শিরোনামে একটি ডকুমেন্টারি প্রকাশ করেছে যেখানে উঠে এসেছে নৃশংস নির্যাতনের চিত্র।
৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে সেই তালিকায় শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খানসহ বেশ কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গুমের অভিযোগ দাখিলের সময়ে আদালতে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে মীর আহমদ বিন কাসেমও ছিলেন, যিনি আরমান নামে পরিচিত। তার মামলা নিয়েও আমরা কাজ করেছি। ২০১৬ সালে গুম হওয়ার কয়েকদিন আগে তিনি আমাকে লিখেছিলেন, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি “চিন্তিত”। এরপর আট বছর গোপন সেনা গোয়েন্দা হেফাজতে রাখা হয় তাকে, হাসিনা সরকারের পতনের পর মুক্তি পান তিনি।’
মীনাক্ষী লিখেছেন, ‘ওই সময়ে তার স্ত্রী প্রায়ই আমাকে ফোন করতেন, কোনও খবর পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। এখনও গুমের শিকার অনেকের পরিবার সেই আশা নিয়েই অপেক্ষা করেন। আরমান সম্প্রতি আমাকে জানিয়েছেন, তিনি ভালো আছেন এবং একটি বই লিখেছেন।’
প্রতিবেদনের শেষে মীনাক্ষী লিখেছেন, ‘আমরা মানবাধিকারকর্মীরাও এই ধরনের অলৌকিক ঘটনার জন্য অপেক্ষা করি। তারপরও অনেক সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন চলতেই থাকে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্তদের বিচার করা হবে। যদিও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে।’


