দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ গত তিন মাসে ৬৮ হাজার কোটি টাকা কমেছে। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হারও ২ দশমিক ৮২ শতাংশ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশে, যদিও সামগ্রিক ঝুঁকি এখনো উচ্চ পর্যায়েই রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের সিএল-১ বিবরণী অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ দশমিক ৯২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।
এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ শেষে শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ দশমিক ২৫ কোটি টাকা বা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক প্রান্তিকে শ্রেণিকৃত ঋণ কমেছে ৮৭ হাজার ২৯৮ দশমিক ৩৩ কোটি টাকা এবং হার কমেছে ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ পয়েন্ট।
তবে বছরওয়ারি চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। ডিসেম্বর ২০২৪ শেষে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের গ্রস হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। সেই হিসাবে এক বছরে এই হার বেড়েছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট।
প্রভিশন ও স্থগিত সুদের সমন্বয়ের পর নিট শ্রেণিকৃত ঋণের হার ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে নেমে এসেছে ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশে, যা সেপ্টেম্বর ২০২৫ শেষে ছিল ২৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রেও কমেছে ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ পয়েন্ট।
শ্রেণিকৃত ঋণের ভেতরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ দশমিক ৮৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। তিন মাস আগে, সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ১২ হাজার ৮৭১ দশমিক ৪৫ কোটি টাকা বা ৩২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ফলে এক প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমেছে ৬৮ হাজার ৩৯ দশমিক ৫৭ কোটি টাকা এবং হার কমেছে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ পয়েন্ট।
ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, শ্রেণিকৃত ঋণ ও খেলাপি ঋণ এক জিনিস নয়। শ্রেণিকৃত ঋণ হলো সমস্যাগ্রস্ত সব ঋণের সমষ্টি, যেখানে সাবস্ট্যান্ডার্ড থেকে ব্যাড/লস পর্যন্ত সব স্তর থাকে। অন্যদিকে, খেলাপি ঋণ হলো এই শ্রেণিকৃত ঋণের সবচেয়ে খারাপ অংশ, যা সাধারণত ব্যাড/লস পর্যায়ের ঋণকে বোঝায়।
এদিকে, ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের চাপ সবচেয়ে বেশি। ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে এ ধরনের ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের গ্রস হার দাঁড়িয়েছে ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বর শেষে ছিল ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ তিন মাসে কমেছে ৫ দশমিক ২২ শতাংশ পয়েন্ট।
একই সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে এই হার কমে ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমেছে, যা আগে ছিল ৩৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বিদেশী ব্যাংকে হার কমে হয়েছে ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ (আগে ৪ দশমিক ৯২ শতাংশ) এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে নেমে এসেছে ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশে (আগে ৪১ দশমিক ৯৫ শতাংশ)। ফলে প্রান্তিকভিত্তিক হিসাবে রাষ্ট্র মালিকানাধীন, বেসরকারি, বিদেশি ও বিশেষায়িত ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার যথাক্রমে ৫ দশমিক ২২, ৫ দশমিক ৫১, দশমিক ৪২ ও ২ দশমিক ২১ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।
এদিকে, ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৪ শেষে মোট ঋণ ছিল ১৭ লাখ ১১ হাজার ৪০১ দশমিক ৯১ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ দশমিক ৪৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৫১৩ দশমিক ৫৩ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
এই সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেই ঋণ প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। তাদের বিতরণ করা ঋণ বেড়েছে ৯৬ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক প্রান্তিকে সূচকগুলো কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত দিলেও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সম্পদের গুণগত মান এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে, বিশেষ করে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে।


