কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে দরবার শরিফে হামলা চালিয়ে ‘পীর’ আব্দুর রহমান ওরফে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে ও হত্যার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও প্রতিহত করার চেষ্টা করেনি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রোববার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন।
এই প্রশ্নে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘জনতার তুলনায় সদস্য সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। ওই পরিস্থিতিতে পুলিশের পক্ষে শত শত বিক্ষুব্ধ জনতাকে প্রতিহত করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।’
ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজ শেখ জয়নুদ্দিনও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি এই হত্যার বিচারের আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘এখানে যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এটা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না।’
২০২৩ সালের পুরোনো একটি ভিডিও সামনে এনে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সেখানে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় ‘পীর’ আব্দুর রহমানকে।
গত শনিবার দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় দরবারে হামলা চালিয়ে সেটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে একদল মানুষ।
২০২৩ সালের পুরোনো একটি ভিডিও সামনে এনে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সেখানে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় ‘পীর’ আব্দুর রহমানকে। আহত হন তার তিন অনুসারী জুবায়ের, মহন আলী ও জামিরুন নেছা। তারা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এই ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মধ্যে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছাড়াও উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
তিনি বলেন, ‘কেউ অন্যায় করলেও আইন হাতে তুলে নেওয়া যায় না। অন্যায় করলে আইন-আদালত আছে। তার বিচার হবে। যেটা হয়েছে এটা অন্যায়। এটা মেনে নেওয়া যায় না। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে, কোনো ছাড় হবে না।’
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, ‘এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। বিজিবির টহল ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন।’
দৌলতপুরের হোসেনাবাদে লালনশিল্পী শফি মন্ডলের গ্রামের বাড়িতেও পুলিশ পাহারা রাখা হয়েছে। জেলার ছেঁউড়িয়ায় বাউলসাধক ফকির লালন সাঁইয়ের মাজারেও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
নৃশংসতা উঠে এল ময়নাতদন্তে
রোববার দুপুরে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ‘পীর’ আব্দুর রহমানের মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার হোসেন ইমাম জানান, মুখমণ্ডলেই ১৫ থেকে ১৮টি কোপের দাগ রয়েছে। মাথা, ঘাড়, পিঠেও গভীর জখমের আলামত দেখা যায়। ‘একাধিক জখমের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে তার মৃত্যু হয়েছে’, বলেন তিনি।
ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ মরদেহ নিয়ে যায়।
জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ দুপুরে জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকিতে ফিলিপনগর গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয় আব্দুর রহমানকে।
মুখমণ্ডলেই ১৫ থেকে ১৮টি কোপের দাগ রয়েছে। মাথা, ঘাড়, পিঠেও গভীর জখমের আলামত দেখা যায়।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, ‘এই ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি, তবে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।’
মরদেহ দাফনের পর পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নিহতের বড় ভাই ফজলুর রহমান।
ভাই ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় হামলা
‘পীর’ আব্দুর রহমানের বড় ভাই স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক ফজলুর রহমান বলেন, ‘শনিবার দুপুরে নামাজ শেষ করে বাড়িতে এসে খাচ্ছিলাম। এরপর মানুষের চিল্লাচিল্লির শব্দ শুনতে পাই। বাড়ির বাইরে বের হয়ে দেখি দরবারের সামনে মানুষ ব্যাপক ভাঙচুর চালাচ্ছে।’
‘এ সময় ভাইকে দোতলায় তার থাকার ঘর থেকে টেনে নিচে নামিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর ও কোপাতে থাকে। পরে পুলিশের গাড়িতে করে ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়’, বলেন তিনি।
‘পীর’ আব্দুর রহমান তাদের হাতজোড় করে না মারার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু রড-লাঠি দিয়ে মাথায় আর মুখে এলোপাতাড়ি মারা হতে থাকে। হামলাকারীদের অধিকাংশের বয়স ছিল ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, দরবার থেকে কিছু দূরেই আবেদের ঘাট এলাকায় ঘোষণা দিয়ে শতাধিক মানুষকে জড়ো করানো হয়। দুপুর আড়াইটার দিকে মিছিল নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে ওই দরবারে হামলা চালায় ও আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনার সময় পুলিশ উপস্থিতি ছিল।
৭০-৮০ জন লোক রড লাঠিসোঁঠা হাতে নিয়ে দরবারের গেট ভাঙচুর শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা দোতলায় ‘পীরের’ ঘরের সামনে যায়। তারা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে তাকে মারতে মারতে নিচে নামিয়ে আনে।
এ সময় ‘পীর’ আব্দুর রহমান তাদের হাতজোড় করে না মারার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু রড-লাঠি দিয়ে মাথায় আর মুখে এলোপাতাড়ি মারা হতে থাকে। হামলাকারীদের অধিকাংশের বয়স ছিল ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।


