জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় ছাদের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলি করাসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে।
এখন রায় কবে ঘোষণা করা হবে তার তারিখ জানা যাবে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দিন ধার্য করে।
এদিন যুক্তি উপস্থাপন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। এসময় আসামি রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চলকে নির্দোষ দাবি করেন আইনজীবী সারওয়ার জাহান। প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগের সঙ্গে নিজের মক্কেলের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া পলাতক চারজনের হয়ে যুক্তি দেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। তিনিও মক্কেলদের নিরপরাধ দাবি করেন। পরে যুক্তি খণ্ডন করে প্রসিকিউশন।
এর আগে ২৯ জানুয়ারি এ মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচ আসামির সর্বোচ্চ সাজা চায় প্রসিকিউশন। প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এমএইচ তামিম।
যুক্তিতর্কে প্রসিকিউশনের পক্ষে বলা হয়, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে সারাদেশের মতো রামপুরায়ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে তৎকালীন সরকারের পুলিশ বাহিনী। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নিরস্ত্র আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়, যা স্পষ্টতই মানবতাবিরোধী অপরাধ। এছাড়া আরও দুজনকে হত্যা করা হয়। পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দিসহ নথিপত্রে এ মামলার পাঁচ আসামির সম্পৃক্ততা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ এ মামলায় আসামি পাঁচজন।
তারা হলেন ডিএমপির খিলগাঁও জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান, রামপুরা থানার সাবেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) তরিকুল ইসলাম ভূইয়া এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার।
এর মধ্যে চঞ্চল চন্দ্র সরকার গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
এর আগে এ মামলায় গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে আদালত। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার বিচার শুরু হয়।
গত বছরের ৭ আগস্ট প্রসিকিউশনের পক্ষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। গত ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সংস্থা।
গণঅভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আমির হোসেন জুমার নামাজ পড়ে বাসায় ফিরছিলেন। বাসার কাছে তখন সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান তিনি। এ সময় পুলিশ গুলি শুরু করে। আমির হোসেন দৌড়ে নির্মাণাধীন একটি ভবনের চারতলায় গিয়ে আশ্রয় নেন।
একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে পুলিশ ভবনটির চারতলায় ওঠে। সেখানে আমির হোসেনকে পেয়ে পুলিশ সদস্যরা তার দিকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে বারবার নিচে লাফ দিতে বলেন। একজন পুলিশ সদস্য তাকে ভয় দেখাতে কয়েকটি গুলিও করেন। ভয়ে আমির হোসেন লাফ দিয়ে নির্মাণাধীন ভবনটির রড ধরে ঝুলে থাকেন। তখন তৃতীয় তলা থেকে একজন পুলিশ সদস্য আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে ছয়টি গুলি করেন। গুলিগুলো আমিরের দুই পায়ে লাগে।
পরে পুলিশ চলে গেলে আমির হোসেন ঝাঁপ দিয়ে কোনোরকমে তৃতীয় তলায় পড়েন। তখন তার দুই পা দিয়ে রক্ত ঝরছিল। পরে আমির হোসেনকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি। এছাড়া একই দিন রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নিহত হন।


