দেশজুড়ে লোডশেডিং: মন্ত্রীর এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ

দেশজুড়ে লোডশেডিং: মন্ত্রীর এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

সারা দেশে তীব্র তাপদাহের মধ্যে লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও বিদ্যুৎ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নির্বাচনী এলাকা সিরাজগঞ্জ শহরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের অধিকাংশ মানুষ যখন বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছেন, তখন এই শহরে মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা পাচ্ছেন।

তবে শহরের বাইরে জেলার গ্রামীণ জনপদে চিত্রটি একেবারেই উল্টো। সেখানে ঘনঘন লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নিজ জেলা শহর বগুড়ায় প্রধানমন্ত্রীর সফরের পরদিনই লোডশেডিং-এ ভুগেছে মানুষ।

সিরাজগঞ্জের স্থানীয় সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা রুবেল জানান, গ্রামগুলোতে প্রচণ্ড লোডশেডিং হলেও সিরাজগঞ্জ শহরে এর কোনো প্রভাব নেই। শহরে বিদ্যুৎ গেলেও আধা ঘণ্টার মধ্যে চলে আসে, কিন্তু গ্রামে বিদ্যুতের দেখা পাওয়াই ভার।

সিরাজগঞ্জের দরগাপাড়া এলাকার ফার্মেসি মালিক জাহিদ হোসেন জানান, আগে দিনে চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ যেত। তবে গত শনিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত সেখানে কোনো লোডশেডিং হয়নি, যা তাদের বড় স্বস্তি দিয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা অবশ্য সিরাজগঞ্জে বিশেষ সুবিধার কথা অস্বীকার করেছেন। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) ডিভিশন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, ওই এলাকায় সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কারণে দিনের বেলা লোডশেডিং হয় না।

তিনি জানান, সেখানে ৬২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সরকারি সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু আছে। তার দেওয়া তথ্যমতে, সিরাজগঞ্জ পৌরসভায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৫ মেগাওয়াট। তবে গ্রামীণ এলাকায় কেন বিদ্যুৎ সরবরাহ কম, সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

শহরের বাইরে লোডশেডিংয়ের প্রভাবে স্থানীয় তাঁতশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়ালেখায় বিঘ্ন ঘটছে। উল্লাপাড়া উপজেলার পচলিয়া গ্রামের তাঁত মালিক কল্লোল সরকার জানান, দিনে চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ না থাকায় কাপড়ের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

আরও পড়ুন

জ্বালানি সংকটে তারা ডিজেলচালিত মেশিনও চালাতে পারছেন না, অথচ শ্রমিকদের মজুরি ঠিকই দিতে হচ্ছে। তাড়াশ উপজেলার বাসিন্দা নুরুল হক জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে তারা ঠিকমতো ফসলের জমিতে সেচ দিতে পারছেন না।

সারা দেশের সামগ্রিক লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার অমিল পাওয়া যাচ্ছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির হিসাব মতে, দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি মাত্র ১৫ শতাংশ। তবে পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (প্রজন্ম) মো. জহুরুল ইসলাম স্বীকার করেন, লোডশেডিংয়ের পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের একাধিক তদারকি দল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

বগুড়ায় লোডশেডিং

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের ঠিক পরপরই বগুড়ায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। সফরের সময় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও তিনি চলে যাওয়ার পরদিন থেকেই লোডশেডিং শুরু হয়।

বগুড়া শহরের বাসিন্দা আব্দুল আজিজ জানান, বুধবার সকাল থেকে প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর বিদ্যুৎ চলে গেছে। নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মান্নাফ মিয়া জানান, বগুড়া শহরে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় শহরকে প্রাধান্য দিয়ে শহরতলী ও গ্রামে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বগুড়ার কাহালু উপজেলার কৃষক এনামুল হক জানান, দিনে ছয়-সাতবার বিদ্যুৎ যাওয়ায় রাতের ঘুম হারাম হযে যাচ্ছে। বোরো ক্ষেতে সেচ দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। শিবগঞ্জ ও শেরপুর এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা জানান, তারা চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাচ্ছেন।

সাতক্ষীরায় তীব্র গরমের সঙ্গে লোডশেডিং যোগ হয়ে মৎস্য চাষিদের বড় ক্ষতির মুখে ফেলেছে। আশাশুনির বড় দল গ্রামের হারুন উর রশিদ জানান, রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় পাম্প চালানো যাচ্ছে না। ফলে গরমে তার ২৫ বিঘা খামারের মাছ মারা যাচ্ছে। সাতক্ষীরা শহরের শেখ ফরিদ আহমেদ ময়না জানান, সেখানে প্রতিদিন প্রায় ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।

ময়মনসিংহের গ্রামগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। নান্দাইলের একজন অভিভাবক জানান, মেয়ের পরীক্ষার জন্য চার্জার ফ্যান কিনলেও বিদ্যুৎ না থাকায় সেটি চার্জ করা সম্ভব হচ্ছে না। গফরগাঁওয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মজিবুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, তারা দিনে মাত্র পাঁচ-ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ পান। গৌরীপুরের কাপড় ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা জানান, সকালে আধা ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না।

কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলেও সংকট চরমে পৌঁছেছে। ইটনার আলমগীর ফরিদ জানান, তারা দিনে চার ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। মিঠামইনের অটো-রিকশা চালক আজিজুর রহমান জানান, রিকশা চার্জ দিতে না পারায় তার আয় বন্ধ হয়ে গেছে। ফ্রিজের খাবারও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবে কিশোরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. আতিকুজ্জামান চৌধুরী এই সংকটের কথা অস্বীকার করে বলেন, হাওর এলাকায় অন্তত ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad