কনটেন্ট ক্রিয়েটর, অভিনেত্রী ও চিত্রনাট্যকার কারিনা কায়সারের মৃত্যু যেন একসঙ্গে কাঁদিয়েছে বাংলাদেশের ডিজিটাল কনটেন্ট অঙ্গন, শোবিজজগতকে। মাত্র কয়েক দিনের অসুস্থতা, তারপর দ্রুত অবনতি—শেষ পর্যন্ত ভারতের চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেমে গেল তার জীবনের পথচলা। শনিবার ভোররাতে বাবা, জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক কায়সার হামিদের আবেগঘন ফেসবুক পোস্টে আসে সেই সংবাদ।
কারিনা ছিলেন সাবেক ফুটবলার ও ক্রীড়া সংগঠক কায়সার হামিদের মেয়ে এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দাবাড়ু রানী হামিদের নাতনি। পরিবারিক পরিচয়ের বাইরে তিনি নিজের পরিচয় গড়ে নিয়েছিলেন একেবারেই নিজস্ব ভঙ্গিতে—প্রাণবন্ত উপস্থাপনা, জীবনঘনিষ্ঠ কনটেন্ট এবং সহজাত রসবোধ দিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণ দর্শকদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। পরে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও নাটকেও কাজ শুরু করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্যকার হিসেবেও পরিচিতি পান। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ওয়েব সিরিজ ‘ইন্টার্নশিপ’ এবং চলচ্চিত্র ‘৩৬-২৪-৩৬’।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন কারিনা। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, হেপাটাইটিস এ–তে আক্রান্ত হওয়ার পর তার অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। আগে থেকেই ফ্যাটি লিভারের সমস্যা ছিল। নতুন জটিলতা যুক্ত হয়ে একপর্যায়ে তার লিভার ফেইলিউর হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার দিবাগত রাতে জেট এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে ভারতের চেন্নাই নেওয়া হয়।
চেন্নাইয়ের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথমে কিছুটা আশার খবর মিললেও পরে হঠাৎ পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। গণমাধ্যমকে কায়সার হামিদ জানান, ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে কারিনাকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছিল। সেই সময় হঠাৎ তার রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যায়। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে আনতে পারেননি।
মেয়ের মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে কায়সার হামিদ লেখেন, ‘আমার প্রাণপ্রিয় আদরের মেয়ে কারিনা একটু আগে চেন্নাইতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমাদের ছেড়ে ওপারে চলে গেছে।’ একই পোস্টে তিনি মেয়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চান এবং লিখেন, ‘আমার মেয়ের কোনো ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলে কিংবা কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে আপনারা তাকে ক্ষমা করে দিবেন।’
কারিনার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় স্মৃতিচারণ, শোক আর ভালোবাসায়। নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘যখন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ডাক আসছিলো তুমি নির্দ্বিধায় দাঁড়াইছিলা, কারিনা। বাংলাদেশ তোমাকে মনে রাখবে।’ ফারুকী আরও স্মরণ করেন কারিনার রসবোধ, উপস্থিতি এবং একসঙ্গে কাজের স্মৃতি। তার ভাষায়, ‘আমরা বলছিলাম, আমরা তোমার ফ্যান। তুমি লজ্জা পেয়ে হাসতেছিলা।’
বন্ধু ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর কামরুন নাহার ডানা, যিনি ‘ডানা ভাই জোস’ নামে পরিচিত, তিনি লিখেছেন, ‘কারিনার হাসিটাই ছিল সবচেয়ে সুন্দর। কারিনা ছিল সুখ, বন্ধুত্ব আর মমতার আরেক নাম।’ জন্মদিনের একটি স্মৃতি তুলে ধরে তিনি জানান, কারিনা তাকে বলেছিলেন, ‘আমি যতদিন বেঁচে আছি, সারাজীবনই করব।’
উপস্থাপক রুম্মান রশীদ খানও ভাগ করে নিয়েছেন এক বেদনাময় স্মৃতি। কারিনার একটি সাদাকালো ছবি প্রকাশ করে তিনি জানান, ছবিটি দেখে কারিনা একদিন মজা করে বলেছিলেন, ‘আমি মারা যাবার পর এই ছবিটা দিয়েন!’
ক্যারিয়ারের শুরুতে কারিনা মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবে পরিচিতি পান। তবে খুব দ্রুতই তিনি নিজেকে আলাদা করে তুলেছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থাপনা, বুদ্ধিদীপ্ত রসবোধ এবং বাস্তবজীবনের গল্প বলার ভঙ্গিতে। তার ভিডিওতে ছিল এক ধরনের সহজ ঘরোয়া আন্তরিকতা, যা দর্শকের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে দিত। সেই জনপ্রিয়তাই তাকে নিয়ে যায় অভিনয় ও চিত্রনাট্য লেখার জগতে।
কারিনার মৃত্যু শুধু একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের বিদায় নয়; এটি এমন এক তরুণ মুখের হারিয়ে যাওয়া, যিনি ধীরে ধীরে নিজের শিল্পীসত্তাকে বিস্তৃত করছিলেন। মৃত্যুর পর তার সহকর্মী, বন্ধু ও ভক্তদের অসংখ্য পোস্টে বারবার ফিরে এসেছে একটি কথাই—কারিনা ছিলেন প্রাণবন্ত, সহানুভূতিশীল এবং আশপাশের মানুষকে আনন্দে ভরিয়ে রাখার মতো একজন মানুষ।
চেন্নাইয়ের হাসপাতালের সেই শেষ লড়াই শেষ হয়েছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা তার হাসি, কৌতুক আর স্মৃতিগুলো হয়তো দীর্ঘদিন ধরে বেঁচে থাকবে মানুষের মনে।


