কফ সিরাপে শিশুর মৃত্যু: ওষুধ কোম্পানিকে আর সময় দেবে না ভারত

কফ সিরাপে শিশুর মৃত্যু: ওষুধ কোম্পানিকে আর সময় দেবে না ভারত
স্রেশন ফার্মাসিউটিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার তৈরি কফ সিরাপ। ছবি: রয়টার্স
Advertisement
Advertisement

ভারতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কফ সিরাপ সেবনে অন্তত ২৪ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ওষুধ প্রস্তুতকারকদের কারখানা মানোন্নয়নের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন নাকচ করে দিয়েছে দেশটির সরকার। কর্তৃপক্ষ বলছে, আন্তর্জাতিক মান না মানায় একের পর এক শিশুসহ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। তাই আর সময় বাড়ানোর সুযোগ নেই।

সম্প্রতি ভারতের মধ্যপ্রদেশের পারাশিয়া অঞ্চলে সাড়ে তিন বছর বয়সী শিশু মায়াঙ্ক সূর্যবংশী জ্বরে আক্রান্ত হলে স্থানীয় চিকিৎসক তাকে ‘কোল্ডরিফ সিরাপ’ সেবনের পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই শিশুটির অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে এবং ৯ অক্টোবর ভোরে কিডনি বিকল হয়ে মারা যায়।

শিশুটির বাবা, দিনমজুর নিলেশ সূর্যবংশী বলেন, ‘আমরা ভাবতেও পারিনি সাধারণ জ্বর-সর্দির ওষুধ এভাবে বিষ হয়ে উঠতে পারে। আমার সন্তানই শেষ হয়ে গেল।’

মায়াঙ্কের মৃত্যুর কারণ সামনে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে গোটা প্রদেশ। ওষুধ সেবনের মাধ্যমে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।

তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, শিশুটির মৃত্যুর পেছনে মূল প্রভাব রেখেছে স্রেশন ফার্মাসিউটিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের ‘কোল্ডরিফ’ সিরাপই মায়াঙ্ককে দেওয়া হয়।

প্রেস্ক্রিপশনে ভেজাল কফ সিরাপ। ছবি: রয়টার্স

সরকারি ল্যাব পরীক্ষায় দেখা যায়, এই সিরাপে ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ ডাইইথিলিন গ্লাইকোল রয়েছে। যা ভারত ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে প্রায় ৫০০ গুণ বেশি।

এই রাসায়নিক একটি বিষাক্ত দ্রব্য। অনেকে ওষুধ তৈরির সস্তা দ্রবণ হিসেবে এই বিকল্প ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে গ্লিসারিন বা প্রোপিলিন গ্লাইকোলের মতো নিরাপদ কাঁচামালের খরচ কমিয়ে অধিক ব্যবসা করা হয়।

আরও পড়ুন

এর আগে, আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ায় ভারতীয় ফার্মাসিউটিক্যালসের উৎপাদিত কফ সিরাপ খেয়ে ১৪০ জনের বেশি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করে। এতে ‘ফার্মেসি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ খ্যাত ভারতের ওষুধ রপ্তানিতেও বড় ধাক্কা আসে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের শেষ দিকে ভারত সরকার দেশের সব ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মান অনুযায়ী তাদের উৎপাদন প্ল্যান্ট আধুনিকায়ন করার নির্দেশ দেয়। এর আওতায় ব্যাচ টেস্টিং, ক্রস-কন্টামিনেশন প্রতিরোধের প্রোটোকলসহ কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিতের নির্দেশ দেওয়া হয়।

বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো ২০২৪ সালের জুনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় মানোন্নয়ন সম্পন্ন করলেও ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সময়সীমা ছিল ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত। তবুও ওই কোম্পানিগুলো সময়সীমা বাড়ানোর জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ বরাবর একাধিকবার আবেদন করে যাচ্ছিল। অনেক প্রস্তুতকারক জানায়, গোটা উৎপাদন প্ল্যান্ট ‘আপগ্রেড’ করতে যে খরচ হবে তা তাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। সরকার তাৎক্ষনিকভাবে সে আবেদন আমলে নিলেও এরই মাঝে শিশু মায়াঙ্কের মৃত্যুর ঘটনা সরকারের অবস্থানকে স্পষ্ট করে।

সেই সঙ্গে ভারতের ফার্মাকোপিয়া কমিশন (আইপিসি) এখন থেকে সব তরল ওষুধে ডিইজি ও ইথিলিন গ্লাইকোল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া, স্রেশন ফার্মার ওষুধ সেবনে মৃত্যুর ঘটনায় ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে তাদের উৎপাদনের লাইসেন্স বাতিল করে উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানের মালিক এস. রঙ্গনাথনকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্রেশন ফার্মার দাপ্তরিক কার্যালয় ছিল একটি আবাসিক ভবনের ভেতরে। তাদের কারখানাটি ছিল একটি জরাজীর্ণ ভবনে। সেখানে নোংরা পরিবেশে ওষুধ প্রস্তুত ও মোড়কজাত করা হতো।

তদন্তকারীদের মতে, প্রতিষ্ঠানটি নানাভাবে প্রচলিত আইন ও মান লঙ্ঘন করেছে। তারা উৎপাদিত ওষুধের প্রতিটি ব্যাচ পরীক্ষা করেনি, যাচাই করেনি ওষুধ তৈরির কাঁচামাল। এক তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘এই কারখানা ওষুধ উৎপাদনের জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত।’

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের। এ খাতে প্রায় তিন হাজার কোম্পানির ১০ হাজারেরও বেশি উৎপাদন ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ ওষুধ উৎপাদন করে অনুমোদিত ও আন্তর্জাতিক বিধান মেনে চলা বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো। বাকি ৪০ শতাংশের মতো আসে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান থেকে।

ভারতের এসএমই ফার্মা ইন্ডাস্ট্রিজ কনফেডারেশনের (ক্ষুদ্র শিল্প) সেক্রেটারি জগদীপ সিং সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেন, ‘হিমাচল প্রদেশের প্রায় অর্ধেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে যদি সময়সীমা বাড়ানো না হয়। এতে দেশে ওষুধের ঘাটতি, বেকারত্বসহ জাতীয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।’

ভারত সরকার এর জবাবে বলে, ‘সময়সীমা বারবার বাড়ানো যাবে না। মানুষ মারা যাচ্ছে। বড় কোম্পানিগুলো যেহেতু এরইমধ্যে মানোন্নয়ন করেছে, তারা চাইলে উৎপাদনে ঘাটতি পূরণ করতে পারবে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad