ফেসবুকে একটি টক শো। অংশগ্রহণকারীদের একজন নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নেতা মনিরুল ইসলাম রবি। তিনি আক্ষেপ করছিলেন বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে। বলছিলেন, ‘যদি আমরা পাকিস্তান থাকতাম তাহলে আমরা এখন পারমাণবিক শক্তির মালিক থাকতাম। সারা পৃথিবী আমাদেরকে স্যালুট দিত।’
মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ দশক পর, যখন অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য অবকাঠামোসহ মানব উন্নয়ন সূচকের প্রায় সব দিকেই পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে, এমন সময় দুই বছর ধরে এই বিএনপি নেতার মতোই আরও অনেকে বলার চেষ্টা করছেন, পাকিস্তান ‘ভাঙা’ ঠিক হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর এই ‘পাকিস্তান পন্থা’র উত্থান নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো বটেই, সংবাদ মাধ্যমের টক শোতে এসেও রবির মতো আরও অনেকে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেন ভুল’ সেই যুক্তি তুলে ধরছেন।
রবি সেই টকশোতে আরও বলেছেন, ‘আমরা যদি তাদের (পাকিস্তান) অংশ হতাম তাহলে আমরা গর্ববোধ করতে পারতাম। দুর্ভাগ্য আমরা সে জায়গা থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’
এখানেই শেষ নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরা জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী স্বাধীনতাবিরোধী নেতার গুণগান করে বলেছেন, ‘এটা গোলাম আযমের বাংলাদেশ, এটা মতিউর রহমান নিজামীর বাংলাদেশ, এটি আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের বাংলাদেশ।’
গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়েছে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ভুল সিদ্ধান্ত এবং পাকিস্তান ‘ভেঙে’ এ দেশের মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
এই দুই বছরে মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান নিয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় হামলা, অংশগ্রহণকারীদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার, জাতীয় সঙ্গীত আয়োজনে বাধা, রাজধানী ঢাকায় প্রকাশ্যে স্বাধীনতাবিরোধী নেতা গোলাম আযমের পক্ষে স্লোগান দিয়ে, ‘গোলাম আযমের বাংলায়’ বলার মতন ঘটনা যেমন ঘটেছে; তেমনি মুক্তিযুদ্ধের বেশিরভাগ ভাস্কর্যই ভেঙে দেওয়া হয়েছে, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবন বুলডোজার নিয়ে গিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, দেশজুড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও অপমানের অন্তত ২৫টি ঘটনার পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলাই যেন এখন ঝুঁকিপূর্ণ।
সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ্যেই মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরা দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকরা। সম্প্রতি জামায়াতের সমর্থক ইসলামী ছাত্র শিবিরের এক কেন্দ্রীয় নেতা পাকিস্তান সফরে গেলে বুদ্ধিজীবী হত্যায় অভিযুক্ত আলবদর বাহিনীর প্রশংসাসূচক গানে তাকে স্বাগতও জানানো হয়।
পাল্টে গেছে মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা
গত ৯ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস হয়। এটি অধ্যাদেশ আকারে জারি করেছিল মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।
আইনটিতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টি এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধকেই মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।
সমালোচনা আছে, মুসলিম লীগ-জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের দায় ঢেকে দেওয়ার জন্য এই ‘তৎকালীন’ শব্দটি যোগ করা হয়েছে।
সংসদে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান আইনের সংজ্ঞা থেকে জামায়াতের নামও বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। তিনি সংসদে বলেন, ‘একাত্তরে কার কী ভূমিকা ছিল তা একমাত্র আল্লাহই পূর্ণাঙ্গভাবে জানেন।’
দুই ব্যারিস্টারের মুক্তিযুদ্ধ দর্শন
টেলিভিশন ও অনলাইন টক শোতে পরিচিত মুখ হয়ে উঠা জামায়াত সমর্থক আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির ও এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই পাকিস্তানের পক্ষ গলা ফাটাচ্ছেন।
শাহরিয়ারের দাবি, ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের পরাধীনতার দিন। তার দাবি, এর আগ পর্যন্ত স্বাধীন ভূখণ্ড ছিল, এরপর বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে চলে যায়।
তিনি আরেক আলোচনায় বলেছেন, ‘১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হয়নি, পরাধীনতা শুরু হয়েছে।’
এই আইনজীবীর দাবি, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, এখানে বাংলাদেশের কোনো সংশ্লেষ নেই। অথচ মুক্তিযুদ্ধের আত্মসমর্পণের দলিলে লেখা আছে, ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ বাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন পাকিস্তানি বাহিনীর জেনারেল নিয়াজী।
টাইমস অব বাংলাদেশকে শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে কয়েক হাজার মানুষ মারা গেছে। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই লাখ বিহারীকে হত্যা করা হয়েছে।’
এবি পার্টির নেতা ২১ ডিসেম্বর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমি ১৬ ডিসেম্বর মানি না, আমি নতুন দিবসের খোঁজ করছি।’
মুক্তিযোদ্ধারা ‘গুণ্ডা’, আলবদর বাহিনী ‘সংগ্রামী’
সম্প্রতি পাকিস্তান সফর করেন জামায়াত সমর্থক ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তাকে স্বাগত জানানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে পাকিস্তান জামায়াতের ছাত্র সংগঠন। ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি উর্দু গানে মুক্তিবাহিনীকে ‘গুণ্ডা’ ও বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত আলবদর বাহিনীকে ঢাকা রক্ষায় ‘সংগ্রামী’ উল্লেখ করা হয়।
জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের ছেলে আবদুল্লাহিল আমান আযমী ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি তোলেন। তার দাবি ‘আমার সোনার বাংলা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী নয়।’
জামায়াত এবং তার জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই সংবিধানকেও ‘ভারতীয় ষড়যন্ত্র’ হিসেবে প্রচার করছে এই দল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুতে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা ফেসবুক পোস্টে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ‘সহস্র’ দাবি করেন।
ছাত্রশিবিরের মাসিক মুখপত্র ‘ছাত্র সংবাদ’ এর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর সংখ্যায় ‘যুগে যুগে স্বৈরাচার ও তাদের করুণ পরিণতি’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে বলা হয়, ‘সে সময়ের অনেক মুসলিম না বুঝে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন, যা তাদের ব্যর্থতা ও অদূরদর্শিতা ছিল।’
মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেওয়া
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙাসহ সব চিহ্ন মুছে ফেলার ঘটনাও ঘটে। রাজধানীর ধানমন্ডিতে বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাড়ি সিটি কর্পোরেশনের বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হয়।
গাজীপুরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়, মেহেরপুরের ঐতিহাসিক মুজিবনগরে একদিনেই ভেঙে ফেলা হয় মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অস্থায়ী সরকারের শপথ নেওয়ার প্রায় ৩০০ ভাস্কর্য।
এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভেঙে ফেলার ঘটনাও ঘটে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে মুক্তিযুদ্ধ ও ৭২-এর সংবিধান সমুন্নত রাখার এক সেমিনারে হামলা চালানো হয়। সেখান থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় পুলিশ।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করেন খোদ মুক্তিযোদ্ধারাই। সেসময় মুক্তিযোদ্ধা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বর্তমান বাংলাদেশ দেখে বোঝার উপায় নেই যে এখানে কখনো মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল।’
এক লেখায় অর্থনীতিবিদ, লেখক ও রাজনৈতিক-অধিকার কর্মী আনু মুহাম্মদ মন্তব্য করেন, মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধার প্রসঙ্গ এলেই একটি মহলের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়। এ কারণেই মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী ও ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে মব সন্ত্রাস চালানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন মুক্তিযোদ্ধা মনোরঞ্জন ঘোষালও। এসবকে তিনি জাতির ইতিহাস ও স্মৃতির প্রতি চরম অসম্মান বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘রাজাকার সংসদে পৌঁছছে, এটি জাতির জন্য লজ্জার বিষয়।’
মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণী ঘোষ বলেন, ‘কেউ কেউ ইতিহাসের বাস্তবতাকে আড়াল করে নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।’
এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রয়াত মুস্তফা মনোয়ার টাইমস অব বাংলাদেশ’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করেছিলেন: ‘মানুষ কি আমাদের সেই আত্মত্যাগ ভুলে যাচ্ছে?’


