হাত হারানো শ্রমিকের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ: আলম মিয়ার জীবন সংগ্রাম

হাত হারানো শ্রমিকের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ: আলম মিয়ার জীবন সংগ্রাম
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

এক সময়ের কারখানা শ্রমিক আলম মিয়া এখন ঢাকার রাজপথে রিকশা চালান। তার জীবনের সব নিরাপত্তা কেড়ে নিয়েছে একটি দুর্ঘটনা।

এক হাত হারিয়ে এখন তিনি ভাড়া করা রিকশার হ্যান্ডেল ধরে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। রিকশা চালিয়ে পরিবার ও খাবারের খরচ মেটানোর পর মাস শেষে তার সঞ্চয় বলতে কিছুই থাকে না। তিনি সবচেয়ে বেশি অভাব বোধ করেন তার হারানো কর্মস্থলের নিরাপত্তার।

আলম মিয়া বলেন, চাকরিতে মাস শেষে বেতন ও ভবিষ্যৎ সহায়তার একটি ভরসা থাকে। রিকশা চালিয়ে তিনি সেই নিরাপত্তা পান না। তিনি একাই নন, তার মতো হাজারো মানুষ একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। রিকশা, ভ্যান ও ইজি বাইক শ্রমিক ইউনিয়নের মতে, ঢাকা শহরে প্রায় ১০ লাখ অটোরিকশা এবং ৬০ থেকে ৮০ হাজার প্যাডেল রিকশা চালক রয়েছেন। তাদের সবার জীবনযাত্রা প্রায় একই রকম।

সূর্য ওঠার আগেই আলম মিয়া রিকশা নিয়ে ঢাকার জটলার রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। এক হাতে রিকশা চালানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য কাজ। প্রতিটি ট্রিপে তাকে বাড়তি শ্রম দিতে হয়। তবুও তিনি থামতে পারেন না। আলম মিয়া জানান, সব খরচ বাদে প্রতিদিন তার প্রায় ৭০০ টাকা থাকে। কিন্তু বাড়িতে পরিবারের জন্য সেই টাকা খরচ হয়ে যায়। দিন শেষে তার কোনো সঞ্চয় থাকে না।

একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রিকশা চালকদের নিট সঞ্চয় মাত্র ৩ শতাংশ। মাত্র ২৪ শতাংশ চালক সব খরচ শেষে কিছু টাকা জমাতে পারেন। তারা আয়ের ৭৮ শতাংশই ব্যয় করেন খাবার ও ঘর ভাড়ার পেছনে। এমনকি ৫৭ শতাংশ রিকশা চালক আয়ের চেয়ে ব্যয়ের চাপে ঋণগ্রস্ত অবস্থায় থাকেন।

শেরপুরের নকলা উপজেলার বাসিন্দা আলম মিয়া ২০০৩ সালে প্রথম কাজের সন্ধানে ঢাকা আসেন। এরপর থেকে কখনও গ্রামে আবার কখনও ঢাকায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। প্রায় চার বছর তিনি একটি কারখানায় নিয়মিত আয়ে কাজ করেছিলেন। কিন্তু একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা তার সবকিছু বদলে দেয়।

আরও পড়ুন

দুর্ঘটনার স্মৃতিচারণ করে আলম মিয়া বলেন, সহকর্মীর আনা একটি শিশু কারখানার ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। শিশুটি না বুঝে একটি সুইচে চাপ দিলে তার হাত যন্ত্রে আটকে গিয়ে থেঁতলে যায়। চিকিৎসকরা অনেক চেষ্টা করেও তার হাতটি বাঁচাতে পারেননি। ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ায় শেষ পর্যন্ত হাতটি কেটে ফেলতে হয়।

এই পঙ্গুত্ব আলমের কারখানা জীবনের ইতি টেনে দেয়। ক্ষতিপূরণ হিসেবে কারখানা কর্তৃপক্ষ তাকে মাত্র ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিল। এরপর কারখানাটিও বন্ধ হয়ে যায়। কর্মহীন হয়ে আলম মিয়া গ্রামে ফিরে যান এবং সেখানে দুই বছর কাটান। কিন্তু গ্রামে আয়ের উৎস না থাকায় ২০২৩ সালে আবারও ঢাকায় ফিরে রিকশা চালানো শুরু করেন।

বর্তমানে তিনি মাসে ২০ দিনের মতো ঢাকায় থাকেন এবং রিকশা চালিয়ে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা বাড়িতে নিতে পারেন। ২০২২ সালে বিয়ে করা আলম মিয়ার একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। স্ত্রী ও সন্তান গ্রামে থাকেন। তিনি একবার পরিবারকে ঢাকায় আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার স্ত্রী বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাদের গ্রামে পাঠিয়ে দেন। সেখানে অন্তত তার সন্তান খোলামেলা পরিবেশে বড় হতে পারছে।

এখন মুঠোফোনের কথা বলা আর মাঝে মাঝে বাড়িতে যাওয়াই তার একমাত্র যোগাযোগ। আলম মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, উপার্জিত অর্থ দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না। তবুও তিনি স্বপ্ন দেখেন তার সন্তানকে শিক্ষিত করবেন। তিনি মনে করেন, এই কাজে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তাই সন্তান লেখাপড়া শিখলে তার চেয়ে ভালো থাকতে পারবে।

পুরনো দিনের কথা ভেবে আলম মিয়া মাঝে মাঝে হতাশ হন। কারখানায় কাজ করার সময় তার বেতন ছিল ৬ হাজার টাকা। আজ তার অনেক সহকর্মী সেখানে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করছেন। আলম মিয়া বলেন, হাতটি ঠিক থাকলে তিনিও হয়তো আজ ভালো আয় করতে পারতেন।

আলম মিয়ার মতে, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় আহতদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। তিনি মনে করেন, কারখানাগুলোতে যদি শারীরিক প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের জন্য কাজের সুযোগ থাকত, তবে তার মতো অনেক শ্রমিককে রাস্তায় নামতে হতো না।

আপাতত ঢাকার রাস্তায় চাকা ঘোরানোর নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শুরু ও শেষ হয় তার প্রতিটি দিন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad