বাংলাদেশের বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের জন্য একটি ভেঙে পড়া আর্থিক সাম্রাজ্য পুনর্গঠন করা তা গড়ে তোলার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন বলে প্রমাণিত হচ্ছে। ব্যাংক কেলেঙ্কারি, বিপুল পরিমাণ ঋণ জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের সঙ্গে ব্যাপকভাবে জড়িত একসময়ের ধরাছোঁয়ার বাইরের এই চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠীটি এখন সম্পদ বাজেয়াপ্ত, আইনি চাপ এবং তীব্র জনরোষের মুখে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদের কাছে এখন আসল প্রশ্ন এটি নয় যে কীভাবে এই গ্রুপটি ব্যাংকিং খাতে তাদের আধিপত্য হারিয়েছে, বরং মূল প্রশ্ন হলো তারা কি কখনো তা ফিরে পাবে?
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে পরবর্তী সরকারগুলো এই গ্রুপের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি একাধিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পুনর্গঠন করে, এই গ্রুপের প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ার অবরুদ্ধ করে এবং তাদের প্রধান প্রধান সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব জব্দ করার পদক্ষেপ নেয়।
এই পদক্ষেপের ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়। এর ফলে হাজার হাজার কর্মচারী ক্ষতিগ্রস্ত হন, যাদের একটি বড় অংশ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাসিন্দা, বিশেষ করে এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল আলমের নিজ এলাকা পটিয়ার মানুষ।
বিএনপির সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এস আলম আবারও তাদের প্রভাব ফিরে পেতে পারে বলে গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল। সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিদায়ের পর এই জল্পনা আরও তীব্র হয়। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে নতুন করে কার্যক্রমের প্রাথমিক লক্ষণ, চাকরিচ্যুত কর্মচারীদের বিক্ষোভ এবং নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা ব্যাংকিং খাতে এই গ্রুপের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়।
তবে কয়েক মাস পার হওয়ার পর একটি ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং তীব্র তদবিরের পরেও বেশিরভাগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আগের মতোই কঠোর অবস্থায় বহাল রয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়া আরও গভীর হয়েছে, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের চেষ্টাও আন্তর্জাতিকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। সরকারের ভেতরে এখন আলোচনা এস আলমের পুনর্বাসন নিয়ে নয়, বরং তদন্তকারীদের ধারণা অনুযায়ী বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে পাচার হওয়া শত শত কোটি ডলার উদ্ধার করার দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।
আন্দোলন মোড় ঘুরাতে ব্যর্থ
নিজেদের প্রভাব পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে স্পষ্ট চেষ্টা দেখা যায় চাকরিচ্যুত ব্যাংক কর্মকর্তাদের সমন্বিত বিক্ষোভের মাধ্যমে। আগে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত থাকা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ শরিয়াহভিত্তিক ছয়টি ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত হওয়া সাবেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ঢাকার মতিঝিলে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের একটি বিশাল অংশ চট্টগ্রাম অঞ্চলের পটিয়া ও সাতকানিয়া এলাকা থেকে এসে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। সেখানে তারা নতুন পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে ভেঙে দেওয়ার দাবি জানান। আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশের সংশোধিত ব্যাংক রেজ্যুলেশন অ্যাক্টের কথা উল্লেখ করে যুক্তি দেন, এই আইনটি সমস্যাগ্রস্ত বা একীভূত হওয়া ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য সাবেক মালিকদের সুযোগ দেয়।
পটিয়ার বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনাম স্বীকার করেন, চাকরিচ্যুত কর্মীদের অনেকেই তার নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, তিনি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। কারণ তাদের বেশিরভাগই তার এলাকার এবং চাকরি হারিয়ে তারা আর্থিক কষ্টের মধ্যে আছেন।
তবে এই উদ্বেগ তুলে ধরার পরও তাদের চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি।
আদালত থেকে আইনি প্রতিকার পাওয়ার আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ার পর চাকরিচ্যুত কর্মীরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে রাজনৈতিক সমঝোতা এবং প্রশাসনিক তদবিরের দিকে মনোযোগ দেন। এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এবং ইসলামী ব্যাংকের সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক তৌহিদুল ইসলাম জানান, নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ বজায় রাখার জন্য একটি ছোট সমন্বয় দল গঠন করা হয়েছে। তিনি জানান, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত তারা কোনো ইতিবাচক সাড়া পাননি।
এই বিক্ষোভ দ্রুতই সাধারণ আমানতকারীদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়। “ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক সমন্বয় কাউন্সিল” নামের একটি সংগঠন একই স্থানে পাল্টা মানববন্ধনের আয়োজন করে। এই পাল্টা আন্দোলনকারীরা ব্যাংক লুটের জন্য দায়ীদের গ্রেপ্তার, পাচারকৃত সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং করপোরেট ও রাজনৈতিক দখলদারত্ব থেকে ব্যাংকের স্বাধীনতা রক্ষার দাবি জানান।
সংসদ থেকে সতর্কবার্তা
সরকার যে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে চায় তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া গেছে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে প্রকাশ করেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ নজিরবিহীনভাবে প্রায় পাঁচ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি দেশের শীর্ষ ২০ জন ঋণ খেলাপির তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন, যার অর্ধেকেরও বেশি সরাসরি এস আলম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত। এনসিপি দলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর একটি লিখিত প্রশ্নের জবাবে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
এই তালিকায় নাম থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, এস আলম রিফাইনড সুগার এবং এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলসসহ এই শিল্পগোষ্ঠীর বেশ কয়েকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বেক্সিমকো লিমিটেড এবং কেয়া কসমেটিকসের মতো অন্যান্য বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও এই তালিকায় ওপরের দিকে রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী সংসদে জানান, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের চিহ্নিত করতে এবং সম্পদ উদ্ধারের গতি বাড়াতে ব্যাংক কোম্পানি আইনের অধীনে ইতোমধ্যে নতুন কঠোর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এই কৌশল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, তাদের এখন সরাসরি আইনসভা ও প্রশাসনিক নজরদারির অধীনে ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা সভার মুখোমুখি হতে হবে।
অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে সংসদে এই তথ্য প্রকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। এ তথ্য ইঙ্গিত দেয় নতুন সরকার শীর্ষ খেলাপিদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কোনো গোপন সমঝোতা না করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে।
তাছাড়া এই প্রকাশ্য বক্তব্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের সেই অভিযোগকে দুর্বল করে দিয়েছে, যারা আগে সতর্ক করেছিলেন যে প্রশাসনের ভেতরে কিছু প্রভাবশালী পক্ষ এস আলমের পুনর্বাসনের পথ তৈরি করছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী মন্তব্য করেন, অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য একটি স্পষ্ট এবং প্রয়োজনীয় বার্তা দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী সরকার কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে ইসলামী ব্যাংককে এস আলমের হাতে তুলে দিয়েছিল তা সাধারণ মানুষ ভালো করেই জানে। তিনি মনে করেন, সেই কাজের জন্য কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব।
যে আইনটি আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল
সরকারের কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও সংশোধিত ব্যাংক রেজ্যুলেশন অ্যাক্ট সংসদে পাস হওয়ার পর বিতর্ক আরও তীব্র রূপ নেয়। সংশোধিত আইনের বিধান অনুযায়ী, সংকটাপন্ন বা একীভূত হওয়া ব্যাংকের সাবেক মালিকরা দেনা পরিশোধ এবং কঠোর আর্থিক পুনর্গঠনের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মালিকানা ফিরে পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন।
এই বিধানটি অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং আর্থিক খাত সংস্কার কর্মীদের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস সতর্ক করে জানায়, বিতর্কিত সাবেক মালিকদের আর্থিক ব্যবস্থায় ফিরে আসার সুযোগ দিলে তা ভঙ্গুর ব্যাংকিং সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং জনমনে আস্থার সংকট বাড়াবে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোও এই আইনের বিষয়ে তীব্র আপত্তি তোলায় সরকার এটি পুনর্মূল্যায়ন করছে। এই আন্তর্জাতিক চাপ এস আলমের আর্থিক সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার চেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সমালোচকরা যুক্তি দিচ্ছেন, এস আলমকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পুনরায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়া হলে তা আওয়ামী লীগ পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল ভিত্তি জবাবদিহিকে পুরোপুরি মুছে দেবে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থই মূল প্রশ্ন
রাজনৈতিক কোলাহল এবং আদালতের লড়াইয়ের বাইরে বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে এখন আরও বড় একটি বিষয় প্রধান হয়ে উঠেছে। তদন্তকারীরা বিশ্বাস করেন, এস আলমের আর্থিক আধিপত্যের বছরগুলোতে কোটি কোটি ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এখন মূল আলোচনা হলো কীভাবে সেই অর্থ উদ্ধার করা যাবে। চলমান আলোচনার সঙ্গে পরিচিত একাধিক ঊর্ধ্বতন সূত্র টাইমসকে জানায়, এস আলম সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলোর ভবিষ্যৎ পরিচালনার সুযোগ এখন সম্পূর্ণরূপে এই পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ওপর নির্ভর করছে।
এই সন্দেহভাজন অফশোর সম্পদের কিছু অংশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, এমনকি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কাঠামোর অধীনেও দেশে ফেরত আনা সম্ভব কি না, তা কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখছেন।
সরকারের ভেতর এখন বাস্তব উপলব্ধি, এই কোটি কোটি ডলার উদ্ধার করা কেবল একটি শিল্পগোষ্ঠীকে ভেঙে ফেলার চেয়ে দেশের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তকারীরা এই গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি এবং ভুয়া কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক মাধ্যমের সাহায্যে বিদেশে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ তদন্ত করছেন। এই কেলেঙ্কারিকে এখন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থ পাচারের ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের ধারণা, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের মধ্যে এই অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যখন এস আলম ইসলামী ব্যাংক এবং অন্যান্য কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।
তদন্তকারীদের অনুমান, এই শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলো বিতর্কিত অর্থায়নের মাধ্যমে কেবল ইসলামী ব্যাংক থেকেই ৭০ হাজার কোটি থেকে ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে, যা ব্যাংকের মোট ঋণ পোর্টফোলিওর অর্ধেকেরও বেশি।
এই তদন্তের পরিধি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। এস আলম পরিবারের সদস্যরা তাদের সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্বের সুরক্ষা ব্যবহার করে বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটসে (আইসিএসআইডি) আন্তর্জাতিক সালিশি মামলা দায়ের করে বাংলাদেশের সম্পদ বাজেয়াপ্তের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করার পর সরকার তার আইনি লড়াই জোরদার করেছে। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রের অবস্থান সুরক্ষিত করতে কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক আইন সংস্থা হোয়াইট অ্যান্ড কেস এলএলপি-কে নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে।
নির্বাসন থেকে পরিচালিত সাম্রাজ্য
এদিকে এক সময়ের বিশাল এই শিল্প সাম্রাজ্যের বড় অংশই আংশিকভাবে অচল হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এস আলমের মালিকানাধীন বেশ কয়েকটি কারখানা হয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে অথবা তাদের উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। কারণ এর প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল আলম, তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্রমবর্ধমান তদন্ত ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
এই শিল্পগোষ্ঠীর একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টাইমসকে জানিয়েছেন, ব্যাংক হিসাব জব্দ হওয়ার কারণে গ্রুপের আমদানি কার্যক্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, কারখানা বন্ধ থাকার পরেও শুরুতে কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়েছিল, তবে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার কারণে শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই করতে হয়, যার ফলে অনেক বিশ্বস্ত কর্মকর্তাও স্বেচ্ছায় কোম্পানি ছেড়ে চলে যান।
এই অচলাবস্থার মধ্যে একটি বড় ব্যতিক্রম হলো বাঁশখালীর গণ্ডামারায় অবস্থিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র যা যৌথভাবে এস আলম গ্রুপ এবং তাদের চীনা অংশীদারদের মালিকানাধীন। প্রায় ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বর্তমানে পুরোপুরি চালু রয়েছে এবং এস আলম এই উদ্যোগে তার ৭০ শতাংশ শেয়ার ধরে রেখেছে।
বিভিন্ন সূত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে সাইফুল আলম সিঙ্গাপুর থেকে এই শিল্পগোষ্ঠীর বৈশ্বিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের কিছু অংশ পরিচালনা করছেন, অন্যদিকে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা কানাডা এবং যুক্তরাজ্য থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছেন। কিছু বিশ্বস্ত সহযোগী সৌদি আরব থেকেও গ্রুপের পক্ষে সক্রিয় রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আপাতত এস আলম গ্রুপ এক চরম আর্থিক পতন, আন্তর্জাতিক তদন্ত, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং সরকারের সম্পদ পুনরুদ্ধার অভিযানের মাঝে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, যাকে কর্মকর্তারা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক ঐতিহাসিক লুণ্ঠন হিসেবে দেখছেন।


