এবার ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ হিসেবে ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল ফ্রান্স। স্থানীয় সময় সোমবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভার আগে বিশ্বনেতাদের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের শুরুতেই এ ঘোষণা দেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
তার সিদ্ধান্তকে তাৎক্ষণিক স্বাগত জানান ১৪০ জনেরও বেশি বিশ্বনেতা। করতালিতে ম্যাক্রোঁকে অভিবাদন জানান জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের প্রতিনিধি দলের রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মানসুর।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের হলে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ফ্রান্সের ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির প্রতি অবিচল থেকে আমরা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছি।’
সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত ওই সম্মেলনে ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি কারণ সময় এসে গেছে। আমাদের দায়িত্ব “দ্বি-রাষ্ট্র” সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করা।’
ম্যাক্রোঁ তার ভাষণে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে একটি ‘পুনর্গঠিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ’ গঠনের প্রস্তাব দেন। এর আওতায় একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর (ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স) সহায়তায় তারা গাজায় শাসন প্রতিষ্ঠা করবে।

ফ্রান্সের পরপরই অ্যান্ডোরা, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা ও মোনাকোও ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে বলে নিশ্চিত করেছে। এর আগের দিনই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগাল।
ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ভিডিও বার্তায় দেশগুলোকে ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য আমাকে ভিসা দেয়নি। যেসব দেশ এখনও আমাদের স্বীকৃতি দেয়নি, তাদের প্রতি আহ্বান জানাই। একইসঙ্গে আমরা জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ পাওয়ার দাবি জানাই।’
এদিকে জার্মানি, ইতালি ও জাপান ওই বৈঠকে অংশ নিলেও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়নি। উচ্চপর্যায়ের ওই বৈঠক বর্জন করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলের জাতিসংঘ দূত ড্যানি ড্যানন বৈঠকটিকে ‘সার্কাস’ হিসেবে আখ্যা দেন। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া “হামাসকে পুরস্কার” দেওয়ার শামিল।’
এর আগে গত বছর ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় স্পেন, নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ড। সে সময় গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর অযাচিত হামলার অভিযোগে ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞাও জারি করে মাদ্রিদ।
এ নিয়ে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশের সংখ্যা দাঁড়াল প্রায় ১৪৭-এ। অর্থাৎ বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি দেশ ইতোমধ্যেই ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে পূর্ণ সদস্যপদ পেতে হলে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সম্মিলিত অনুমোদন প্রয়োজন। তবে যেখানে বারবার ভেটো দিয়ে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ফলে গাজায় ‘গণহত্যা’ চালিয়ে যাওয়া ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ আরও বেড়ে গেছে। সোমবারের সম্মেলনে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, ‘যখন একটি রাষ্ট্রের জনগণ “গণহত্যার” শিকার হচ্ছে, তখন দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান আর সম্ভব নয়। মানবতা, আন্তর্জাতিক আইন ও মর্যাদার খাতিরে আমাদের অবিলম্বে এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে হবে।’
এসময় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি “একটি অধিকার, কোনো পুরস্কার নয়।” সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ বলেন, ‘দুই-রাষ্ট্র সমাধানই টেকসই শান্তির একমাত্র পথ।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইসরায়েল শুধু গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে না, দখলকৃত পশ্চিম তীরেও দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। সেই সঙ্গে কাতারসহ আরব ও মুসলিম দেশগুলোর ওপর হামলা করছে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিপন্ন করছে।


