বন্যপ্রাণীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়াঞ্চলে পাঁচটি রোপওয়ে (রজ্জুপথ) নির্মাণ করেছে বন বিভাগ। এ প্রকল্পের ফলে মহাসড়কে চলাচলরত দ্রুতগতির যানবাহনের ধাক্কায় বন্যপ্রাণীর মৃত্যু ও দুর্ঘটনা কমবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
পরীক্ষামূলকভাবে নির্মিত পাঁচটি রোপওয়ের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের পর ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে বনাঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে এ ধরনের আরও রজ্জুপথ বা উড়াল সেতু নির্মাণ করবে টাঙ্গাইল বন বিভাগ।
এসব উড়াল সেতু দিয়ে বানরসহ অন্যান্য গাছে বসবাসকারী বন্যপ্রাণী মাটিতে না নেমেই নিরাপদে এক পাশ থেকে অন্য পাশে চলাচল করতে পারছে।
টাঙ্গাইল বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মধুপুর গড়াঞ্চলের বুক চিরে আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিকভাবেই বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল খণ্ডিত হয়ে পড়েছে। খাদ্য সংকট ও বংশবৃদ্ধির প্রয়োজনে রাস্তা পার হতে গিয়ে দ্রুতগতির যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে প্রায়ই লজ্জাবতী বানরসহ বিভিন্ন বিরল প্রজাতির প্রাণী প্রাণ হারাত।
মধুপুর জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক। এ সড়কের দুপাশে গহীন অরণ্য ঘেরা। বনের ভেতরে বসবাসরত প্রাণীরা অনেক সময় যানবাহন চলাচলের এ রাস্তাটি পার হতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। তাদের এ সড়ক পারাপারে বন্যপ্রাণীর মৃত্যু কমাতে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের ৫টি পয়েন্টে উড়াল সেতু (রোপওয়ে) রজ্জুপথ নির্মাণ করেছে টাঙ্গাইল বন বিভাগ।
টাঙ্গাইল বন বিভাগ সূত্র আরও জানায়, টাঙ্গাইল বন বিভাগের আওতায় মোট ১,২২,৮৭৬.৯০ একর বনভূমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৯,০০০ একর বনভূমি জবরদখলকৃত। এছাড়া বনের জমির মধ্যে আঞ্চলিক মহাসড়কসহ অনেক রাস্তাঘাট রয়েছে। এ কারণে বন উজাড়, আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং খাদ্যসংকটের কারণে বহু বন্যপ্রাণী অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
রোপওয়ে নির্মাণের পাশাপাশি বন সংরক্ষণ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে মধুপুরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, বনে খাদ্য সংকটের কারণে বানর ও হনুমান দলবেধে খাবারের সন্ধানে মহাসড়কে চলে আসে। এ সময় রাস্তায় চলাচল করা পথচারীরা গাড়ি থামিয়ে তাদের কলা, বিস্কুট ও চিপসসহ নানা ধরনের খাবার দেয়। খাবারের লোভে প্রতিদিন শত শত বানার এ মহাসড়কে নেমে আসে। এ সময় অনেক বানর ও হনুমান গাড়িচাপায় প্রাণ হারায়। বন বিভাগের এ উড়াল সেতু নির্মাণের ফলে বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর হার অনেকটাই কমে আসবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বিভাগীয় সমন্বয়কারী গৌতম চন্দ্র চন্দ জানান, খাদ্য সংকটের কারণে বানরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী খাবারের সন্ধানে বনের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া মহাসড়কে চলে আসে। এ সময় তারা গাড়ির নিচে চাপা পড়ে আহত বা নিহত হয়।
তিনি বলেন, টাঙ্গাইল বন বিভাগ বানরসহ নানা জাতের বন্যপ্রাণী রাস্তা পারাপারের জন্য রোপওয়ে নির্মাণ করে দিয়েছে যা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন বন্যপ্রাণীর প্রাণহানি কমবে, তেমনি বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান এ.এস.এম সাইফুল্লাহ জানান, মধুপুর বনাঞ্চলে দুর্লভ প্রাণী মুখপোড়া হনুমান গাছের উঁচু ডালে থাকতে পছন্দ করে। খাবারের সন্ধানে তারা এক গাছ থেকে অন্য গাছে ঘুরে বেড়ায়। এ সময় বনের ভেতর রাস্তার পাশে থাকা বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে আহত হয়। অনেক সময় উচ্চ ভোল্টেজ তারে জড়িয়ে মৃত্যুও হয়।
অন্যদিকে, মহাসড়কের রাস্তা পার হওয়ার সময় পরিবহনের চাপায় অনেক হনুমান মারা যায়। তাই বনাঞ্চলসংলগ্ন মহাসড়কে এ ধরনের রোপওয়ে নির্মাণের ফলে বন্যপ্রাণীর দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমবে।
মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার মো. মোশাররফ হোসেন জানান, এ প্রকল্পের মাধ্যমে মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের আওতাধীন আঞ্চলিক মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে রাস্তার দুই পাশের সুউচ্চ গাছের সঙ্গে বিশেষ কৌশলে শক্ত দড়ি সংযুক্ত করে এই রোপওয়েগুলো তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে বানর, হনুমান, কাঠবিড়ালিসহ বিভিন্ন বৃক্ষবাসী প্রাণীরা মাটিতে না নেমেই বনের এক পাশ থেকে অন্য পাশে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারছে।
টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাসের মোহসিন হোসেন জানান, বনে বসবাসরত বানর-হনুমান ও নিশাচর প্রাণীরা এ অংশ দিয়ে পাকা রাস্তা পারাপারের সময় প্রায়ই মারা যায়। ধীরগতিতে গাড়ি চালানোর জন্য সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও অনেক চালক তা মানেন না। তাই গাছে বিচরণকারী প্রাণীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য এই রোপওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, প্রকল্পটি ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে শুরু করা হয়েছে এবং ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে মধুপুর শালবন প্রতিষ্ঠা প্রকল্পের আওতায় পঁচিশ মাইল থেকে রসুলপুর বাজার পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচটি রোপওয়ে উড়াল সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।


