আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চট্টগ্রামে ভিন্নধর্মী নির্বাচনী কৌশল বাস্তবায়ন করছে জামায়াতে ইসলামী। একক কোনো বড় সমাবেশের পরিবর্তে একদিনেই একাধিক স্থানে জনসভা আয়োজনের মাধ্যমে অল্প সময়ে বেশি ভোটারের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়েছে দলটি।
এরই অংশ হিসেবে সোমবার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পাঁচটি স্থানে আয়োজিত জনসভায় অংশ নেবেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
নগর জামায়াতের সেক্রেটারি মুহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন, দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙা রাখা এবং বিভিন্ন আসনের ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে।’
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, সফরসূচি সাজানো হয়েছে সময় ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি বিবেচনায় রেখে। প্রথম জনসভা হবে সকাল ৯টায় হেলিকপ্টার যোগে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার নতুন বাজার প্রাথমিক উচ্চবিদ্যালয় মাঠে, সকাল ১০টায় কক্সবাজার পৌরসভা সদরে বাহারছড়া গোল চত্বর মুক্তিযোদ্ধা মাঠে দ্বিতীয় জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। বেলা ১১টায় চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার পদুয়া এসিএম উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তৃতীয়, বেলা ২টায় সীতাকুণ্ড সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে চতুর্থ জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষ জনসভা অনুষ্ঠিত হবে বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিটে চট্টগ্রাম বন্দর স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধারাবাহিকতা উপকূলীয় এলাকা থেকে নগরকেন্দ্রিক ভোটারদের একসঙ্গে কাভার করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।
এর ফলে গ্রামীণ, উপকূলীয় ও নগর এই তিন ধরনের ভোটার শ্রেণির কাছে একদিনেই দলের রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও অঞ্চল পরিচালক মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘বিভাগীয় পর্যায়ে একটি বড় জনসভার পরিবর্তে পাঁচটি স্থানে পাঁচটি জনসভা আয়োজনের মাধ্যমে দশগুণ বেশি মানুষের কাছে দলের বার্তা পৌঁছানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘একাধিক স্থানে ধারাবাহিক সমাবেশ দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা তুলে ধরার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সক্রিয় করে তোলে, যা নির্বাচনের শেষ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’
এই সফরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা পর্যায়ে জামায়াত ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলো মাঠে নেমেছে। পথসভা, গণমিছিল, মাইকিং ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশাসনকে অবহিতকরণ, মঞ্চ প্রস্তুতসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়েছে।
নগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘চট্টগ্রামবাসী সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সোমবার জনসভায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির মাধ্যমে তা আবারও প্রমাণিত হবে।’
জামায়াত তৃণমূল নেতাদের মতে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ ধরনের দৃশ্যমান তৎপরতা নির্বাচনী পরিবেশে দলটির উপস্থিতি ও সক্রিয়তা জোরালোভাবে তুলে ধরতে সহায়ক হচ্ছে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, সমাবেশগুলোতে শফিকুর রহমান চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার পরিকল্পনা তুলে ধরবেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নৈতিক রাজনীতির বার্তা দেয়, যা বিশেষ করে অনিশ্চিত ও নিরপেক্ষ ভোটারদের আকৃষ্ট করার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতের গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক এলাকা হিসেবে পরিচিত। একদিনে একাধিক সমাবেশের মাধ্যমে এই অঞ্চলে দলটির সাংগঠনিক শক্তি, জনসমর্থন ও জোটগত সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি ভোটের আগে শেষ মুহূর্তে জনমত গঠনের চেষ্টা করছে দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর কেবল সমাবেশকেন্দ্রিক নয়; বরং মাঠপর্যায়ের হিসাব, ভোটার শ্রেণি বিভাজন এবং বার্তাভিত্তিক নির্বাচনী কৌশলের একটি সমন্বিত প্রয়োগ।
এদিকে জামায়াতের আমিরের সফর ও সমাবেশকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনের শুরু থেকেই প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সার্বক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। প্রত্যেক প্রার্থীর সমাবেশ ঘিরে বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে। জামায়াতের আমিরের আগমন উপলক্ষে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তার গাড়ির সঙ্গে সামনে ও পেছনে দুটি গাড়ি সার্বক্ষণিক থাকবে। পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যও দায়িত্ব পালন করবেন।’
চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ওই এলাকায় জামায়াতের সমাবেশ ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে বলে জানান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী কমিশনার আমিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।


