প্রথম শ্রেণির পৌরসভা নওগাঁয় আড়াই লাখ মানুষের বাস। তবে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে একটিও পাবলিক টয়লেট (গণ শৌচাগার) নেই। পুরুষরা চক্ষুলজ্জা এড়িয়ে রাস্তা ধারে কিংবা খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে গেলেও শৌচাগারের তীব্র সংকটে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে নানা কাজে ঘরের বাইরে যাওয়া নারীদের।
অনেকে বাড়ির বাইরে বেশি সময় থাকতে হলে বেছে নিচ্ছেন অপর্যাপ্ত পানি পানের কৌশল। এতে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা যায়, ১৯৬৩ সালে নওগাঁ পৌরসভার যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮০ সালে দ্বিতীয় এবং ১৯৮৯ সালে এই পৌরসভা প্রথম শ্রেণিতে উন্নিত হয়। আয়তন প্রায় ৩৮ দশমিক ৩৬ বর্গকিলোমিটার। পৌরসভার মোট ৯টি ওয়ার্ডে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের বসবাস।
প্রতিদিন জেলার ১১টি উপজেলার বাইরেও বিভিন্ন জেলা থেকে এই শহরে নানা কাজে আসেন ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ। অথচ বিপুল এই জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো শৌচাগার নেই।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ার ৩৬ বছর পেরিয়ে গেলেও জনগণের জন্য সেবার মানে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। বিশেষ করে, শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে কোন পাবলিক টয়লেট না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেকে সড়কের পাশে মল-মূত্র ত্যাগ করছেন। এতে পরিবেশ নষ্টের পাশাপাশি রোগ বালাই ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, নওগাঁর ব্যস্ততম পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, ঢাকা বাসস্ট্যান্ড, বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড, বাটার মোড়, তাজের মোড়, গোস্তহাটির মোড়, মুক্তির মোড়, কাজির মোড়, দয়ালের মোড়, কেড়ির মোড়, ডিগ্রি কলেজ মোড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে কোনো পাবলিক টয়লেট নেই। পুরুষরা প্রয়োজনে ড্রেন কিংবা পরিত্যক্ত জায়গাতেই প্রাকৃতিক কাজ শেষ করে নিস্তার পাচ্ছেন। কিন্তু নারীরা পড়ছেন চরম অসুবিধায়।
অনেকে এলেকার বিভিন্ন মসজিদের নির্ধারিত শৌচাগার ব্যবহার করেন। তাতেও বিপত্তি! পরিচ্ছন্ন রাখতে কেবল নামাজের ওয়াক্তে খোলা হয় এ শৌচাগারগুলো। বাকি সময় সেগুলো তালাবদ্ধ থাকে।

নওগাঁ সদর উপজেলার কাটখৈর থেকে জরুরি প্রয়োজনে শহরে আসা গৃহিণী সুলতানা ইয়াসমিন বলেন, ‘গ্রাম থেকে শহরে আসার আগেই প্রসাব-পায়খানার বিষয়টি মাথায় রাখতে হয়। শহরে গেলেই দু:শ্চিন্তায় থাকতে হয়। পুরুষরা যেখানে-সেখানে প্রসাব করতে পারে। কিন্তু আমাদের নারীদের বিপাকে পড়তে হয়। দীর্ঘক্ষণ প্রসাব-পায়খানা চেপে রাখতে হয়।’
মহাদেবপুর উপজেলা থেকে আসা আরেক নারী উম্মে কুলসুম বলেন, ‘আমরা যখন বাইরে যাই আমরা চেষ্টা করি যতটা কম পানি ও খাবার খাওয়া যায়। কারণ কাজের ফাঁকে প্রকৃতির ডাক এলে সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক সময় চেপে থাকতে হয়, আবার অনেক সময় কাজ ফেলেই বাড়ি ফিরে যেতে হয়।’
পাশের বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলা থেকে আসা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘ব্যাক্তিগত কাজ শেষ করার পর শৌচাগারের সংকটে পড়ে উপায় না পেয়ে মসজিদে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি তালা দেওয়া। তাই বাধ্য হয়ে চেপে থাকতে হচ্ছে।’
এ বিষয়ে পরিবেশকর্মী নাইস পারভীন বলেন, ‘নওগাঁ শহরে মতো জায়গায় কোন গণশৌচাগার নেই, এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। শৌচাগারের সংকট সঙ্গে এমন অব্যবস্থা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তো বাড়াচ্ছেই, পাশাপাশি নারীদের দৈনন্দিন চলাফেরায় সৃষ্টি করছে দু:সহ পরিস্থিতি। আমরা চাই এই অবস্থার দ্রুত সমাধান হোক।’
প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় কোনো গণ শৌচাগার না থাকার বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক আবু বক্কর সিদ্দিক নান্নু বলেন, ‘আমাদের কিছু উন্নত ও নারীবান্ধব পাবলিক টয়লেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। আশা করছি দ্রুত আমরা এ কাজ শুরু করব।’
নওগাঁ পৌরসভার প্রশাসক টি.এম.এ. মমিন বলেন, ‘পাবলিক টয়লেট আসলেই প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। একটি প্রকল্পের মাধ্যমে দ্রুতই গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’


