পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বেলুচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়েছে—এমন দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্ট ও একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেছেন স্বঘোষিত বেলুচ প্রতিনিধি মীর ইয়ার বেলুচ। তিনি দাবি করেছেন, বেলুচিস্তানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনী অঞ্চলটির ৮৫ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং ভারতসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি স্বাধীন বেলুচিস্তানকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রদেশটি তামা, স্বর্ণ, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা এবং বিরল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। আরব সাগর উপকূলে অবস্থানের কারণে এটি দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে বেলুচ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো অভিযোগ করে আসছে, কেন্দ্রীয় সরকার এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করলেও স্থানীয় জনগণ তার ন্যায্য সুবিধা পায় না। এই অভিযোগ থেকেই কয়েক দশক ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলমান।
তবে পাকিস্তান সরকার বা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা এখন পর্যন্ত এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
স্বাধীনতার দাবি
১৫ জুলাই এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া পোস্টে মীর ইয়ার বেলুচ দাবি করেন, বেলুচিস্তান আর পাকিস্তানের অংশ নয়।
‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’-এর নামে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, নতুন প্রশাসন নিজস্ব জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, মুদ্রা ও প্রশাসনিক কাঠামো চালু করেছে। পাশাপাশি স্বর্ণ, তামা, গ্যাস ও কয়লাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ারও দাবি করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, পাকিস্তানের কিছু সামরিক সদস্য বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন এবং ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পাকিস্তানি বাহিনীকে অঞ্চল থেকে উৎখাতের লক্ষ্য রয়েছে।
তবে এসব দাবির কোনো স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘদিনের সংঘাত
বেলুচিস্তান পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ হলেও সেখানে দেশের মাত্র ৬ শতাংশ মানুষের বসবাস। ইরান, আফগানিস্তান ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৪৮ সালে কালাত রাষ্ট্র পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকেই সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে। বেলুচদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার তাদের রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত করেছে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুবিধা স্থানীয় জনগণ পায় না।
চীনের কৌশলগত স্বার্থ
বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তান চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আরব সাগর উপকূলের গওয়াদর বন্দর।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হিসেবে ৬৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই করিডরের মাধ্যমে পশ্চিম চীনকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গওয়াদর বন্দর, সড়ক, রেল, জ্বালানি অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং খনিজ সম্পদভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। চাগাই জেলার সাইন্দাক কপার-গোল্ড প্রকল্পও পরিচালনা করছে চীনের একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।
তবে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)সহ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে চীনা প্রকল্প ও নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। ফলে নিরাপত্তা চীনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে।
ভারতের সামনে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ
বেলুচ নেতৃত্ব ভারতের কাছে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি চাইলেও বিশ্লেষকদের মতে, নয়াদিল্লির জন্য বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ভারত যদি বেলুচিস্তানকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে পাকিস্তান সেটিকে নিজের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখবে। একই সঙ্গে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের অবস্থানও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
এ ছাড়া বেলুচিস্তান প্রশ্নে ভারতের অবস্থান চীনের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ তেহরান বরাবরই বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি বিদেশি সমর্থনের বিরোধিতা করে আসছে।
পরিস্থিতি অনিশ্চিত
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাধীন বেলুচিস্তান প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা সীমিত। তবে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা আরও বিস্তৃত হলে তা পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতির পাশাপাশি চীনের সিপিইসি ও বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন নজর থাকবে পাকিস্তান এই দাবির বিষয়ে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানায় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করে।


