রাজধানী ঢাকার ইস্কাটনের গাউসনগর এলাকায় দুই মোটরসাইকেল চালক নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলেন। তাদের কথায় ফুটে উঠছিল এক ধরনের সতর্কতা। একজন অন্যজনকে বলছিলেন, এখন থেকে খুব সাবধানে চলতে হবে। সড়কে এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে, কখন যে মামলা দিয়ে দেয় তার কোনো ঠিক নেই।
যান চলাচলের দিক দিয়ে বিশৃঙ্খল এই মহানগরে চালকদের শৃঙ্খলায় ফেরাতে অতীতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সেসব প্রচেষ্টার অনেকগুলোই সফল হয়নি। এবার চালকদের নিয়মের মধ্যে আনতে প্রযুক্তির ওপর ভরসা করেছে পুলিশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ক্যামেরা দিয়ে নজরদারির প্রথম চার দিনেই বেশ আশাবাদী হয়ে উঠেছেন কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এরই মধ্যে এই প্রযুক্তির সুফল মিলতে শুরু করেছে।
এআই নির্ভর এই ক্যামেরাগুলো শুধু ভিডিও ধারণ করছে না, বরং ট্রাফিক আইন ভাঙার ঘটনা শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা তৈরি করছে। ফলে সড়কে এখন এক নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন পুলিশ সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় থাকছে। এই ব্যবস্থায় পুলিশের কাছে অনুরোধ করে ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনেক চালকের মতে, এখন পুরো রাস্তা জুড়েই যেন অদৃশ্য পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে।
গত ৭ মে থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে এই এআইভিত্তিক ডিজিটাল ট্রাফিক প্রসিকিউশন ব্যবস্থা চালু করে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট শাহবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, কাকরাইল, বিজয় সরণি, রামপুরা এবং গাবতলী থেকে বিমানবন্দর সড়ক পর্যন্ত আধুনিক স্মার্ট সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, ‘এআই বেসড রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ২০১৮ ভায়োলেশন ডিটেকশন সফটওয়্যার’ ব্যবহার করছে। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে ক্যামেরাগুলো ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করছে। এরপর ভিডিও ও স্থিরচিত্রের ওপর ভিত্তি করে অটো জেনারেটেড মামলা তৈরি করা হচ্ছে।
গত ১১ মে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আনিছুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মালিক বা চালকের ঠিকানায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ করা না হয়, তবে সমন বা এমনকি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হতে পারে।
পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্যবস্থা চালুর প্রথম তিন দিনেই আড়াই হাজারের বেশি আইন লঙ্ঘনের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব ফুটেজে মূলত লালবাতি অমান্য করা, স্টপ লাইন ভাঙা, উল্টো পথে চলা এবং হেলমেট ছাড়া বাইক চালানোর মতো ঘটনা দেখা গেছে। এছাড়া সিটবেল্ট না পরা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের চিত্রও উঠে এসেছে। ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট এসব ফুটেজ যাচাই করে তিন শতাধিক ডিজিটাল মামলা করেছে।
আগে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের জন্য মূলত মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের ওপর নির্ভর করতে হতো। একজন সার্জেন্ট বা কনস্টেবলকে সরাসরি আইনভঙ্গের ঘটনা দেখতে হতো এবং গাড়ি থামিয়ে মামলা করতে হতো। এতে অনেক সময় ও জনবল লাগত। অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ নির্ভর করত ব্যক্তিগত বিবেচনা বা প্রভাবের ওপর। নতুন প্রযুক্তির কারণে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে।
ডিএমপি কমিশনার মো. সরওয়ার জানান, এআই প্রযুক্তি কার্যকর হওয়ার ফলে চালকদের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। চালকরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক থাকছেন।
বাংলামোটর এলাকায় রাইড শেয়ারিং চালক মো. আমিনুর জানান, একদিন ব্যস্ততার কারণে ফুটপাত দিয়ে বাইক চালিয়েছিলেন। এর একদিন পরেই তার মোবাইলে মামলার মেসেজ আসে এবং তাকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এখন তিনি বাইক চালানোর সময় অনেক বেশি সচেতন থাকেন।
আরেক চালক হাসমত আলী বলেন, আগে ট্রাফিক পুলিশ না থাকলে তারা শান্তিতে থাকতে পারতেন। কিন্তু এখন ক্যামেরা বসানোর কারণে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়। অন্যদিকে গাড়িচালক নূর ইসলাম বলেন, আগে পুলিশ অন্তত ভুল ধরিয়ে দিয়ে মামলা দিত। এখন ভুল করলে বুঝে ওঠার আগেই মোবাইলে মামলার মেসেজ চলে আসছে।
মাঠপর্যায়ে কর্মরত এসআই হাসিবুল ইসলাম জানান, আগে অনেকেই সিগন্যাল ভেঙে চলে যেত কিন্তু তাদের ধরা সম্ভব হতো না। এখন ক্যামেরার কারণে তাদের বিরুদ্ধে সহজে মামলা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তবে বাইকচালক ফারুক আহমেদ মনে করেন, শুরুতে জরিমানার পরিমাণ কম হওয়া উচিত ছিল। মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেলে পরে জরিমানা বাড়ানো যেত। আরেক চালক মামুন ইসলাম বলেন, পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা হলে তা শোধ করতেই এক মাস সময় লেগে যাবে।


