ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে লোহিত সাগরের তেল পরিবহনপথ বন্ধ করে দিতে হুথিদের নির্দেশনা দিয়েছে তেহরান। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগরীয় অঞ্চলেও নতুন ও গুরুতর হুমকি তৈরি হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় সৌদি আরবের একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল রপ্তানির উদ্দেশে লোহিত সাগরের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এ জলপথ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় সাত শতাংশ পরিবাহিত হচ্ছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতারা এ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তেহরানে অব্যাহত মার্কিন হামলার জেরে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের নিরাপদ সমুদ্রপথ লোহিত সাগর বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরানি নেতারা।
এরইমধ্যে দেশটির মিত্র ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিদের কাছে বার্তাটি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ সূত্র এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি আঞ্চলিক সূত্র।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, তেহরানের অনুরোধ সম্পর্কে সম্প্রতি হুতিদের জানানো হয়েছে। অবশ্য বার্তাটি কীভাবে হুতিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে অথবা মঙ্গলবার ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির পর এটি জানানো হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সূত্রগুলো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
হুতিদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, লোহিত সাগরে মার্কিন মিত্র জাহাজে হামলার প্রস্তুতি নিয়েছে গোষ্ঠীটি। তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন করেছে এবং হামলা শুরুর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেবের দিকে নজর রাখা ইয়েমেনের হোদেইদাহ ও এডেন উপসাগরসংলগ্ন পার্বত্য এলাকায় এসব অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে বলেও নিশ্চিত করেছে হুথি সংশ্লিষ্ট সূত্রটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের হাতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার মধ্যে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেবের ওপর নতুন কোনো হুমকি তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে নতুন দফার যুদ্ধে পারমাণবিক বিস্ফোরণের ঝুঁকিও আরও গুরুতর হয়ে উঠছে।
তেহরানের হস্তক্ষেপে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় এবং ইরানি বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের জেরে ফের কার্যত অচল হয়ে পড়েছে হরমুজ প্রণালি। এমন পরিস্থিতিতে হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজ বা বন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দুটি তেল রপ্তানিপথ একই সঙ্গে ব্যাহত হবে। এতে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিস্তৃত সংঘাতে নতুন একটি যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হবে।
হুতি বিদ্রোহীদের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি আরও জানিয়েছে, ইয়েমেনে অবস্থানরত ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপসের (আইআরজিসি) প্রতিনিধিরাই বাব আল-মান্দেব প্রণালি কখন বন্ধ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করবেন।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে সৌদি আরবের সঙ্গে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতি ভেঙে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনাকে দায়ী করা হচ্ছে। হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে পাল্টা বোমা হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফটের প্রধান মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক টরবিয়র্ন সোলভেদ বলেছেন, হুতি ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, ‘লড়াই তীব্র হয়ে লোহিত সাগরের রপ্তানি অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলে ছড়িয়ে পড়লে অঞ্চলটি থেকে তেল রপ্তানির একমাত্র বড় বিকল্প পথও হুমকির মুখে পড়বে।’
রিয়াদের ঘনিষ্ঠ দুটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, ইরান ও হুতিদের হুমকি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের গোষ্ঠীটি লোহিত সাগর নিয়ে বর্তমানে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে বলেও মনে করছে সৌদি সরকার।
এর আগে গাজা যুদ্ধের সময় হুতিরা জাহাজে হামলা চালালে বড় বড় জাহাজ পরিবহন প্রতিষ্ঠান আফ্রিকা ঘুরে অনেক দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প পথে পণ্যবাহী জাহাজ পরিচালনা শুরু করেছিল।
সৌদি আরব বর্তমানে তার জ্বালানি রপ্তানির ৭০ শতাংশ লোহিত সাগর তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দর দিয়ে পাঠাচ্ছে। সেখানে সরাসরি হামলা হলে তেলের বাজারের জন্য তা বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করবে।
একটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতির সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন ইরানের ধর্মীয় শাসকেরা। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল এবং এ পথ দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানিকে হুমকির মুখে ফেলার চিন্তাও এর অংশ। সূত্রটি একে ‘ইরানি চিন্তাভাবনার’ অংশ হিসেবেই স্বীকার করেছে।
তাদের দাবি, ‘প্রণালিটি বন্ধ করা কঠিন হবে না। বন্দুক হাতে যে কেউ জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে, বিশেষ করে জ্বালানিবাহী বেসামরিক নৌযান। জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন নেই।’
ইরান হুতিদের তার আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ মনে করে। এ জোটে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও রয়েছে। এসব গোষ্ঠী এরইমধ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক সংঘাতে যোগ দিয়েছে। তবে হুতি বিদ্রোহীরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ যুদ্ধে অংশ নেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান হুতিদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। হিজবুল্লাহর মাধ্যমে হুতিদের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন। তবে তেহরান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।


