সর্বোচ্চ গোল নিয়ে যত গোলমাল

সর্বোচ্চ গোল নিয়ে যত গোলমাল
Advertisement
Advertisement

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে গোলের হিসাব নিয়ে এক অদ্ভুত বিভ্রান্তি আছে। চার বছর পরপর বিশ্বকাপ এলেই আলোচনা শুরু হয়—সর্বোচ্চ গোলদাতা কে? নতুন কোনো তারকা কি পুরোনো রেকর্ড ভেঙে ফেলবেন? মেসি কোথায়, এমবাপ্পে কোথায়, ক্লোসা কতটা এগিয়ে, রোনালদো কতটা পিছিয়ে—সংখ্যার এই খেলায় মেতে ওঠে গোটা ফুটবল বিশ্ব। কিন্তু এই আলোচনার মাঝেই প্রায়শই হারিয়ে যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি। গোলের সংখ্যা এক জিনিস, আর সেই গোল করতে কত ম্যাচ খেলতে হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ অন্য জিনিস।

ফলে বিশ্বকাপের গোলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গোলমালটি তৈরি হয় ঠিক এখানেই।

আজ যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হয় বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা কে, সবাই বলবেন লিওনেল মেসির নাম। তার পেছনেই থাকবে কিলিয়ান এমবাপ্পে, মিরোস্লাভ ক্লোসা এবং রোনালদো নাজারিও। কারণ সর্বমোট গোলের তালিকায় তারাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

কিন্তু জানেন কি বিশ্বকাপে গোল করার দক্ষতা, কার্যকারিতা এবং বিস্ময়কর কীর্তির কথা বলতে গেলে সবার আগে উঠে আসার কথা এক ফরাসি ফুটবলার জ্যুস্ত ফতেঁর নাম?

১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে তিনি খেলেছিলেন মাত্র ছয়টি ম্যাচ। সেই ছয় ম্যাচেই করেছিলেন ১৩ গোল। বিশ্বকাপের একক আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটি আজও তার দখলে। সাত দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, বিশ্বকাপে ম্যাচের সংখ্যা বেড়েছে, আসরের পর আসর এসেছে, অসংখ্য কিংবদন্তি ফুটবলার মাঠ কাঁপিয়েছেন, কিন্তু ফতেঁর সেই ১৩ গোলের পাহাড়ে আর কেউ উঠতে পারেননি।

মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বকাপের সর্বকালের গোলদাতাদের তালিকায় ফতেঁর নাম শীর্ষে নেই। কারণ সবাই এখন কোন ফুটবলারের অংশ নেওয়া সবগুলো বিশ্বকাপ আসরের মোট গোল সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করে।

অথচ ফতেঁ খেলেছেন মাত্র একটি বিশ্বকাপ। অন্যদিকে মেসি খেলেছেন ছয়টি, ক্লোসা চারটি, রোনালদো নাজারিও তিনটি এবং এমবাপ্পে তিনটি বিশ্বকাপ। ফলে মোট গোলের সংখ্যায় তাদের এগিয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরেকটি বাস্তবতা।

আরও পড়ুন

মেসি বিশ্বকাপে ১৮ গোল করেছেন ২৮ ম্যাচ খেলে। ক্লোসা ১৬ গোল করতে খেলেছেন ২৪ ম্যাচ। ব্রাজিলের রোনালদো ১৫ গোল করেছেন ১৯ ম্যাচে। এমবাপ্পে ১৬ গোলে পৌঁছেছেন ১৬ ম্যাচেই। আর পেলে তার ১২ গোল করেছেন ১৪ ম্যাচে। এই পরিসংখ্যানগুলো পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, গোলের সংখ্যায় এগিয়ে থাকা মানেই গোল করার দক্ষতায় এগিয়ে থাকা নয়।

বরং ম্যাচপ্রতি গোলের হিসাব করলে ছবিটা নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। সেখানে সবার ওপরে উঠে আসেন ফতেঁ। তার ম্যাচপ্রতি গোলের গড় ২.১৭। আধুনিক ফুটবলের প্রেক্ষাপটে সংখ্যাটি প্রায় অবিশ্বাস্য।

এরপরই দেখা যায় এমবাপ্পের নাম। প্রতি ম্যাচে এক গোলের গড় ধরে তিনি এগিয়ে চলেছেন। পেলের গড়ও ঈর্ষণীয়। ব্রাজিলের রোনালদোও পিছিয়ে নেই। অথচ মোট গোলের তালিকায় তাদের অবস্থান নিয়ে যত আলোচনা হয়, ম্যাচপ্রতি গোলের এই হিসাব নিয়ে ততটা আলোচনা খুব কমই দেখা যায়।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে হয়তো সবচেয়ে অবমূল্যায়িত রেকর্ডও এটাই। কারণ ফুটবল সমর্থকেরা সাধারণত সর্বমোট গোলের সংখ্যাটিই মনে রাখেন। কিন্তু ছয় ম্যাচে ১৩ গোল আর ২৪ ম্যাচে ১৬ গোলের মধ্যে যে বিশাল পার্থক্য আছে, সেটি অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে মেসি, ক্লোসা বা এমবাপ্পের অর্জনের গুরুত্ব কমে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বকাপ খেলে গোল করে যাওয়া নিজেই একটি অসাধারণ কীর্তি। ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা, চারটি আসরে ধারাবাহিকভাবে স্কোর করা কিংবা এক দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা—এসব অর্জনের মূল্যও কম নয়। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে গোলের সংখ্যার সঙ্গে ম্যাচসংখ্যার সম্পর্ক না দেখলে পরিসংখ্যানের পুরো গল্পটা জানা যায় না।

তাই বিশ্বকাপের গোলের ইতিহাসে প্রকৃত প্রশ্নটি হয়তো ‘সবচেয়ে বেশি গোল কে করেছে’ নয়। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত, ‘সবচেয়ে কম ম্যাচে সবচেয়ে বেশি গোল কে করেছে?’

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আজও ফিরে তাকাতে হয় ১৯৫৮ সালের দিকে। ফিরে তাকাতে হয় ফরাসি স্ট্রাইকার ফতেঁর দিকে, যিনি মাত্র ছয় ম্যাচে ১৩ গোল করে এমন একটি রেকর্ড গড়েছিলেন, যা এখনও বিশ্বকাপের সবচেয়ে দুর্লঙ্ঘ্য কীর্তিগুলোর একটি।

তাই বিশ্বকাপের গোলের হিসাব খুললে সবচেয়ে বড় গোলমালটা হলো এই— কম ম্যাচে সর্বোচ্চ গোলের মালিকের নামটি প্রায়ই শীর্ষ গোলদাতাদের আলোচনায় হারিয়ে যায়। অথচ বিশ্বকাপের গোলের আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি এখনও সেই জ্যুস্ত ফতেঁ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad