‘দূরে কাছে কেবলি নগর, ঘর ভাঙে; গ্রামপতনের শব্দ হয়’ এই পঙ্ক্তিটি কবি জীবনানন্দ দাশের ‘পৃথিবীলোক’ কবিতার একটি বিখ্যাত অংশ, যেখানে তিনি আধুনিক সভ্যতার আগ্রাসী রূপ এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের অবক্ষয়কে ফুটিয়ে তুলেছেন। কবি দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক যুগের তীব্র নগরায়ণ ও যান্ত্রিকতার থাবায় শান্ত, সবুজ গ্রামগুলো একে একে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এই ‘পতন’ শুধু মাটির ঘরবাড়ি বা ভৌগোলিক সীমানার ধ্বংস নয় বরং এটি হাজার বছরের গ্রামীণ সংস্কৃতি, সহজ-সরল জীবনবোধ এবং প্রকৃতির বুকে মানুষের চিরায়ত আশ্রয়ের চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার এক নির্মম ও বেদনাদায়ক আর্তনাদ।
ঈদের ছুটি প্রায় শেষ। গ্রাম ফেলে মানুষ ফিরতে শুরু করছে কর্মব্যস্ত নগর জীবনে। ঢাকার দিকে ছুটে এসেছে লাখো মানুষ, চট্টগ্রামের দিকে ফিরছে হাজারও যানবাহন। কয়েকদিনের জন্য খানিকটা স্বস্তিতে থাকা দুই মহানগর আবারও ফিরে যাচ্ছে পরিচিত কোলাহলে। ফাঁকা সড়ক আবার থেমে যাবে যানজটে, পরিষ্কার আকাশ ঢেকে যাবে ধুলা আর ধোঁয়ায়, নগরজীবন আবার ডুবে যাবে যান্ত্রিক ক্লান্তিতে। এর মধ্যেই আজ ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস।
প্রশ্ন হলো—এই দিবস কি কেবল আনুষ্ঠানিকতার? নাকি সত্যিই আমরা পরিবেশ নিয়ে ভাবছি? ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতার বৃত্তে বন্দি থাকবে, নাকি আমরা সত্যিই এক বাসযোগ্য পৃথিবীর কথা ভাবব—তা আজ এক বড় প্রশ্ন। আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে আজ প্রতিনিয়ত ‘গ্রাম পতনের শব্দ’ শোনা যাচ্ছে; উন্নয়নের নামে আমরা গড়ে তুলছি কংক্রিটের এক নির্মম জঙ্গল।
এই প্রশ্নের উত্তর মেলে প্রতিবছর ঈদের ছুটিতে, যখন দেখা যায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম যেন অন্য এক শহরে পরিণত হয়। বাতাসে ধুলা কমে, যানবাহনের চাপ কমে, শব্দদূষণ কমে যায়; শহর তখন যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়। এই কয়েকদিনের অভিজ্ঞতাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—সমস্যাটি আসলে নগরের নয়, সমস্যাটি আমাদের পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের।
বাংলাদেশে নগরায়ণের গতি বিশ্বের দ্রুততমগুলোর একটি। স্বাধীনতার পর ঢাকার জনসংখ্যা ছিল কয়েক লাখ; আজ তা দুই কোটিরও বেশি। বন্দরনগরী চট্টগ্রামও একইভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি পরিবেশগত পরিকল্পনা, খেলার মাঠ, খাল-বিল, সবুজ অঞ্চল কিংবা টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থা।
এই তীব্র পরিবেশগত সংকটের মাঝেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরীর মতো আপসহীন কর্মকর্তাদের সাহসী পদক্ষেপ। ঈদের ছুটির সেই সাময়িক স্বস্তিকে শহরের চিরস্থায়ী রূপ দিতে এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ধ্বংসযজ্ঞ রুখতে তিনি কঠোর আইন প্রয়োগের এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। নগর সম্প্রসারণের নামে যখন খেলার মাঠ, পাহাড় ও খাল-বিল ভরাট করে কংক্রিটের জঙ্গল বানানো হচ্ছিল, তখন তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মুনীর চৌধুরী চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাঁড়াশি অভিযান চালান। তিনি ৬১১ একর পাহাড় ও উপকূলীয় বনভূমি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করেন এবং জলাশয় ও কৃষিজমি দখল করে গড়ে ওঠা ১১টি অবৈধ আবাসন প্রকল্প উচ্ছেদ করে প্রায় আড়াই হাজার একর জমি উদ্ধার করেন।
একইভাবে, ঈদের ছুটিতে যে বায়ু ও শব্দদূষণমুক্ত পরিবেশ আমরা দেখি, তা ধরে রাখার জন্য তিনি ‘দূষণকারীই অর্থ দেবে’ নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন। শহরের বাতাসকে বিষাক্ত করা তিন শতাধিক অবৈধ ইটভাটা তিনি গুঁড়িয়ে দেন এবং তাঁর অভিযানের ফলেই দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ দূষণকারী শিল্প-কারখানায় বর্জ্য শোধন প্ল্যান্ট বা ইটিপি স্থাপিত হয়। পরিবেশ ধ্বংসকারী সিন্ডিকেটের কাছ থেকে তিনি প্রায় ৭৪ কোটি টাকা জরিমানা আদায় করে প্রমাণ করেন, আইনের সঠিক প্রয়োগ ছাড়া টেকসই নগর গঠন অসম্ভব।
আজ ঢাকা বিশ্বের অন্যতম দূষিত নগরী। আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউ এয়ারের বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায়ই ঢাকার নাম উঠে আসে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায়। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বায়ুদূষণ অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ বায়ুদূষণজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (সিআরইএ) এবং ক্যাপসের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়ংকর তথ্য—বাংলাদেশে বায়ুদূষণে যেসব মানুষের মৃত্যু হয়, তাদের প্রায় ৪৮ শতাংশই ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দা। অর্থাৎ উন্নয়নের কেন্দ্রগুলোই আজ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
ঢাকার দিকে তাকালে বোঝা যায়, আমরা উন্নয়নকে কেবল স্থাপনা নির্মাণে সীমাবদ্ধ করেছি। ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল—সবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তা পরিবেশের সঙ্গে সমন্বিত হয়। বাস্তবে আমরা দেখছি ঠিক উল্টো চিত্র। খাল ভরাট হচ্ছে, জলাধার হারিয়ে যাচ্ছে, গাছ কাটা হচ্ছে, নির্মাণকাজের ধুলায় বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
একসময়কার সবুজ ঢাকা আজ কংক্রিটের তাপদ্বীপে পরিণত হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষায়, ঢাকার বড় সংকট হলো সে এখন আর রাখঢাক করে না, নিজেই নিজেকে ঢাকনাবিহীন এক ম্যানহোল। ভবনের ঘনত্ব, উন্মুক্ত স্থানের অভাব এবং সবুজ কমে যাওয়ায় শহরের তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় কয়েক ডিগ্রি বেশি হয়ে যাচ্ছে। গরমে জনজীবন অসহনীয় হয়ে উঠছে। ম্যানহোল যেমন ফাঁদ, ঢাকাও তেমন একটি ফাঁদ। কারো জন্য বিলাসী ক্যারিয়ারের ফাঁদ তো কারো জন্য কোনো মতে টিকে থাকার ফাঁদ।
চট্টগ্রামের অবস্থাও কম ভয়াবহ নয়। পাহাড় কেটে আবাসন নির্মাণ, কর্ণফুলী নদীর দূষণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য, বন্দরকেন্দ্রিক যানবাহনের চাপ—সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নগরের চারপাশের পাহাড়গুলো একসময় প্রাকৃতিক সুরক্ষা দিত; এখন সেগুলোর বড় অংশ ঝুঁকির মুখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামে অপরিকল্পিত পাহাড় কাটার ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি মারাত্মক আকার নিয়েছে। প্রতিবছর বর্ষায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাতের মূল্য শেষ পর্যন্ত মানুষকেই দিতে হচ্ছে। এই নগরের জলাবদ্ধতাকে যতই জলযট বলে ছোট করে দেখানো হোক, মানুষ তো জানে প্রতিটি বর্ষায় সে উন্নয়নে ভেসে যায়। ভেসে যাওয়াই তার নিয়তি।
শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াই এখন পরিবেশগত সংকটে আক্রান্ত। ভারতের দিল্লি শহর আজ বিশ্বের বায়ুদূষণের প্রতীক। শীতকালে সেখানে বিষাক্ত ধোঁয়ার চাদরে ঢেকে যায় আকাশ। স্কুল বন্ধ রাখতে হয়, মানুষকে মাস্ক পরে চলতে হয়। ভারতের মুম্বাই, কলকাতা কিংবা বেঙ্গালুরুও একই চাপের মধ্যে রয়েছে।
সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার বায়ুদূষণ নিয়ে প্রকাশিত একাধিক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই অঞ্চলে পিএম ২ দশমিক ৫ দূষণের মাত্রা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এই সূক্ষ্ম দূষিত কণা মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার এবং শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা সৃষ্টি করছে। এমনকি সাম্প্রতিক গবেষণায় বায়ুদূষণের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য ও মস্তিষ্কের রোগের সম্পর্কও পাওয়া যাচ্ছে।
জাতিসংঘ বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে—নগর উন্নয়ন যদি জলবায়ু ও পরিবেশবান্ধব না হয়, তাহলে ভবিষ্যতের নগরগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। অথচ আমাদের বাস্তবতা হলো, নগর পরিকল্পনায় পরিবেশ এখনও সবচেয়ে অবহেলিত বিষয়গুলোর একটি। বাংলাদেশের নগরগুলোতে মাথাপিছু উন্মুক্ত স্থানের পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অত্যন্ত কম। শিশুদের খেলার মাঠ নেই, হাঁটার জায়গা নেই, নদীগুলো দখল ও দূষণের শিকার, খালগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। শহরের মানুষ প্রতিদিন ধীরে ধীরে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
ঈদের ছুটির ফাঁকা শহর আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—শহর বাঁচাতে হলে শুধু রাস্তা বাড়ালেই হবে না; পরিবেশ বাঁচাতে হবে। উন্নয়ন মানে শুধু সেতু নয়, উন্নয়ন মানে পরিচ্ছন্ন বাতাসও। উন্নয়ন মানে শুধু বহুতল ভবন নয়, উন্নয়ন মানে নদী ও গাছও।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে নানা সেমিনার হবে, আলোচনা হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার আহ্বান উঠবে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই বদলাতে চাই? যদি চাই, তাহলে এখনই প্রয়োজন কিছু জরুরি পদক্ষেপ। প্রথমত, নগর উন্নয়নে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নকে কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গণপরিবহনব্যবস্থা উন্নত করতে হবে, যাতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমে। তৃতীয়ত, নদী, খাল ও জলাধার রক্ষায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। চতুর্থত, নগরে সবুজ অঞ্চল বাড়াতে হবে এবং বৃক্ষনিধন বন্ধ করতে হবে। পঞ্চমত, নির্মাণকাজ ও শিল্পদূষণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের উন্নয়ন দর্শন বদলাতে হবে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে কোনো সভ্যতা টেকসই হতে পারে না। ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে—আমরা কি বাসযোগ্য নগর গড়ছি, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ধ্বংসস্তূপ তৈরি করছি?
জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘গ্রাম পতনের শব্দ হয়।’ আজ আমাদের নগরেও সেই পতনের শব্দ শোনা যাচ্ছে—তবে তা হঠাৎ ভেঙে পড়ার শব্দ নয়; বরং প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাওয়া নদী, কাটা পড়া গাছ, ভরাট হওয়া খাল, ধোঁয়ায় ঢেকে যাওয়া আকাশ আর মানুষের ক্লান্ত শ্বাসের শব্দ। যে নগর উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে নির্বাসনে পাঠায়, সে নগর একদিন নিজেই নিজের ভারে নুয়ে পড়ে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বুক থেকে যদি আমরা এই নীরব পতনের শব্দ শুনতে না পাই, তবে বিশ্ব পরিবেশ দিবস কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ হয়েই থাকবে।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। সাবেক পরিবেশ সাংবাদিক ও নিউ মিডিয়া গবেষক। Email: [email protected]


