ঈদুল ফিতর উপলক্ষে যাত্রা শুরু ও শেষের মোট ১৫ দিনে সারা দেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত এবং এক হাজার ২৮৮ জন আহত হয়েছেন। সোমবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
তিনি জানান, একই সময়ে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত এবং এক হাজার ৪৬ জন আহত হয়েছেন। রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত ও ২২৩ জন আহত এবং নৌপথে আটটি দুর্ঘটনায় আটজন নিহত, ১৯ জন আহত ও তিনজন নিখোঁজ রয়েছেন।
গত বছরের তুলনায় এবার দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি দুইই বেড়েছে বলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
একই সময়ে জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ভর্তি হয়েছেন দুই হাজার ১৭৮ জন। সংগঠনটি বলছে, চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের গত ১৫ দিনের হতাহত পরিসংখ্যানের তুলনায় দেশীয় সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বেশি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঈদযাত্রা শুরুর দিন ১৪ মার্চ থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা ২৮ মার্চ পর্যন্ত এই ১৫ দিনে দুর্ঘটনাগুলো ঘটে। গত বছরের ঈদুল ফিতরে ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত ও ৮২৬ জন আহত হয়েছিলেন। সেই তুলনায় এবার দুর্ঘটনা বেড়েছে ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রাণহানি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা বেড়েছে ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। ঈদে ১২৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৫ জন নিহত ও ১১৪ জন আহত হয়েছেন। যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ১২ শতাংশ, নিহতের ৩৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং আহতের ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ৭১ জন চালক, ৫৫ জন শিশু, ৫৪ জন পথচারী, ৫১ জন নারী, ৪২ জন শিক্ষার্থী, ১০ জন পরিবহন শ্রমিক, সাতজন শিক্ষক, চারজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, তিনজন রাজনৈতিক কর্মী, তিনজন প্রকৌশলী, দুজন সাংবাদিক, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও একজন চিকিৎসকের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে।
যানবাহনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট দুর্ঘটনায় ২৭ দশমিক ১৬ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান, ১৬ দশমিক ২২ শতাংশ বাস, ১৫ দশমিক ২৮ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ কার ও মাইক্রোবাস, ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ নছিমন-করিমন এবং ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা জড়িত ছিল।
এদিকে দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ পথচারীকে চাপা দেওয়ার ঘটনা, ২২ দশমিক ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়া, শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষ, শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ ওড়না পেঁচিয়ে এবং ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে ঘটেছে।
সড়কভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট দুর্ঘটনার ৪৩ দশমিক ০৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০ দশমিক ০৫ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ২১ দশমিক ৯৬ শতাংশ ফিডার রোডে ঘটেছে। এছাড়া ৪ দশমিক ৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ঢাকা মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে এবং শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, নতুন সরকারের সময়েও সড়ক পরিবহন খাতে পুরোনো প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে। ঈদ ব্যবস্থাপনা সভায় যাত্রী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় নীতিনির্ধারণে ভারসাম্য আসেনি। বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের প্রভাবের কারণে ভাড়া নৈরাজ্য, পরিবহন বিশৃঙ্খলা ও সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিবহন খাতে প্রভাবমুক্ত পরিবেশ থাকায় ঈদযাত্রা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন এবারের ঈদে সেই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির অর্থ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান, সদস্য আলমগীর কবির, মনজুর হোসেন ঈসা, ড্রাইভার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সভাপতি বাদল আহমেদ, মনজুর হোসেন ও আজাদ হোসেন টিপু প্রমুখ।


