ইলিশ প্রকল্পের ব্যর্থতা: লক্ষ্য ও অর্জনে ব্যবধান বিস্তর

ইলিশ প্রকল্পের ব্যর্থতা: লক্ষ্য ও অর্জনে ব্যবধান বিস্তর
Advertisement
Advertisement

জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য চালু হয়েছিল উচ্চাভিলাষী ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। পাঁচ বছরে ১৭৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ের পরেও এই প্রকল্পের ফল হয়েছে উল্টো। এই সময়ে ইলিশ উৎপাদন বাড়ার বদলে কমে গেছে। বেড়েছে জেলেদের হতাশা আর প্রকল্পে দুর্নীতি ও অপচয়।

প্রকল্প শুরুর আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার টন। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল চার বছরের মধ্যে উৎপাদন ৭০ হাজার টন বাড়িয়ে ৬ লাখ ২০ হাজার টনে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু বাস্তবে, লক্ষ্য ও অর্জনের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার টন।

‘প্রাকৃতিক কারণ’, দাবি কর্মকর্তাদের

প্রকল্প কর্মকর্তাদের দাবি, মূলত পরিবেশগত কারণেই ইলিশের উৎপাদন কমে গেছে। প্রকল্পের উপপরিচালক পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন ব্যাখ্যা করে বলেন, নদীগুলো দূষিত হয়ে পড়েছে। পলি জমে ভরাট হচ্ছে। নদীর মোহনায় অসংখ্য চর দেখা দিয়েছে। সাগর থেকে নদীতে ইলিশের প্রবেশ করার জন্য পর্যাপ্ত গভীরতা নেই। এ কারণেই ইলিশের সংখ্যা কমেছে।

তবে মৎস্যজীবী, বিশেষজ্ঞ ও উপকূল ও নদীর তীর এলাকায় বসবাসকারী মানুষ এই প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার কারণ দেখছেন ভিন্নভাবে। তাদের মতে, প্রজননের সময় ইলিশ ধরা ও পরে জাটকা ধরার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার দুর্বলতা, নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তা দিতে জেলেদের তালিকা তৈরিতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও সার্বিক অব্যবস্থাপনার কারণেই প্রকল্পটি লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

কমছে বাজেট, বাড়ছে প্রশাসনিক ব্যয়

২০২০ সালে যখন ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটি শুরু হয়, তখন এর বাজেট ছিল ২৪৬ কোটি টাকা, যা পরে সময়সীমা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ২৭৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। সম্প্রতি, এটির সময়সীমা আরও এক বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে। তবে এবার বরাদ্দ কমিয়ে ২২৯ কোটি টাকা করা হয়েছে।

সরকারি নথি অনুযায়ী, প্রথম পাঁচ বছরের ব্যয়ের মধ্যে ৪১ কোটি ১৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বেতন, যানবাহন, নৌকা, রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানিতে। অন্য কথায়, মোট বাজেটের এক-চতুর্থাংশ সরাসরি ইলিশ সংরক্ষণের বদলে প্রশাসনিক খাতে ব্যয় হয়েছে।

আইন প্রয়োগ, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং মৎস্যজীবীদের সহায়তা দিতে খরচ হয়েছে আরও ১৩২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। যদিও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কার্যক্রমগুলো যাদের সবচেয়ে বেশি দরকার এমন মানুষের কাছে পৌঁছায়নি।

‘দুর্নীতির জন্য তৈরি ব্যবস্থা’

আরও পড়ুন

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে মৎস্যজীবীদের সহায়তা সামগ্রী বিতরণ এবং ‘জেলে কার্ড’। নথি অনুযায়ী, নিবন্ধিত মৎস্যজীবীদের প্রশিক্ষণ এবং জাল, গরু ও অন্যান্য সামগ্রী বিতরণে ১০৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দুর্নীতি-জালিয়াতিতে ছেয়ে গেছে এসব কার্যক্রম।

লক্ষ্মীপুরের মাটিরহাট মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং মৎস্য কর্মকর্তারা ঘুষের বিনিময়ে জেলে কার্ড বিতরণ করেন। কেবল তাদের পছন্দের লোকেরাই সরকারি সহায়তা পান। একটি মাত্র জাল পেতেও ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়।’

চাঁদপুর থেকে হাতিয়া পর্যন্ত জেলেরা একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। সরকারি সহায়তার তালিকা থেকে আসল জেলেরা বাদ পড়ছেন। সেই সহায়তা তুলে নিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।

লক্ষ্মীপুরের জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা তুর্জো সাহা স্বীকার করেছেন, ‘সহায়তার জন্য জেলেদের তালিকা করেন স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা। যদিও উপজেলা কমিটি সেগুলো যাচাই করে।’

চাঁদপুরের জেলে ইসমাইল হোসেন সোজাসুজি বলেন, ‘আমরা কখনো প্রশিক্ষণ বা সরঞ্জাম পাইনি। যারা পেয়েছে, তারা সত্যিকারের জেলে নয়।’ নাম প্রকাশ না করে মৎস্য কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে, সুবিধাভোগীদের তালিকার ১০-২০ শতাংশে ত্রুটি রয়েছে।

তবে প্রকল্পের উপপরিচালক মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা অনুমোদিত তালিকার বাইরে যেতে পারি না। যদি তালিকা নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

যে সচেতনতা কারও কাছে পৌঁছায় না

প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ও পরে জাটকা ধরা বন্ধ করতে জনসচেতনতা তৈরির জন্য প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু অনেক জনপ্রতিনিধি জানিয়েছেন, তারা এ ধরনের কর্মসূচির কথা কখনো শোনেননি।

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার একজন ইউপি সদস্য আলম দেওয়ান বলেন, ‘আমাকে কোনো সচেতনতামূলক সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।’

বরিশাল ও শরীয়তপুরের মৎস্য কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, সচেতনতা তৈরির কার্যক্রম প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকে। যাদের জন্য এই প্রচার সবচেয়ে বেশি জরুরি, সেই প্রত্যন্ত এলাকার মৎস্যজীবীদের কাছে এর খবরও যায় না। বরিশালের একজন জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. জামাল হোসেন স্বীকার করেন, ‘হয়তো সব এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি’।

প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহ এসব ত্রুটি স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা অভয়াশ্রম এলাকার মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে একটি এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি সচেতনতা সেমিনার করি। সব জায়গায় যাওয়া সম্ভব নয়। প্রচারণার পরিধি বাড়ানো গেলে অবশ্যই সুফল পাওয়া যাবে।’

অসম প্রয়োগ, অসমান শাস্তি

নির্দিষ্ট সময়ে ইলিশ ও সারাবছর জাটকা ধরার নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্যও প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ব্যয় করেছে ১৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যৌথ অভিযানে খরচ হয়েছে ৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। কিন্তু অনিয়ম আর বৈষম্যমূলক আইন প্রয়োগের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযান।

ভোলার চরফ্যাশনের একটি মাছ বাজারের উপদেষ্টা আমিনুল ইসলাম তুহিন হাওলাদার বলেন, কিছু এলাকায় কঠোর অভিযান হয়। আবার কিছু এলাকায় কিছুই হয় না। গরিব জেলেরা কারাগারে যায়, কিন্তু অনেক বড় ব্যবসায়ী ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।

মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ স্বীকার করেন, অনেক জেলে এখনো নিষেধাজ্ঞার সময় গোপনে মাছ ধরে। তবে এদের সংখ্যা মোট জেলের ১০ শতাংশের বেশি নয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো প্রত্যন্ত এলাকায় যেতে পারে না বলেও জানান তিনি।

এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম এবং ভোলার জেলেরা অভিযোগ করেন, বিদেশি ট্রলারগুলো প্রায়ই গভীর সমুদ্রে ইলিশ ধরে। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ সেদিকে ঠিকমত নজর দেয় না। প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহ স্বীকার করেন, ‘অভিযান পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা আছে। নদীর বাইরে সমুদ্রেও নজরদারি বাড়ানো দরকার’।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad