ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। মার্কিন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনুমোদন দিলে যেকোনো মুহূর্তে ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী স্থল অভিযান শুরু করার মতো প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়, এরইমধ্যে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা ও অভিজাত মেরিন সদস্যরা মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলোতে পৌঁছেছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইরানে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন না হলেও বিশেষ বাহিনী ও সাধারণ পদাতিক সেনাদের সমন্বয়ে সীমিত আকারের অভিযান চালানো হতে পারে।
তবে এ ধরনের অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের জন্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে শঙ্কা জানিয়েছেন তারা। ইরান স্থল অভিযানের প্রতিশোধ নিতে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিবেশী দেশগুলোতেও স্থল হামলা এবং আইইডির (ইম্প্রোভাইজড বিস্ফোরক) ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অবশ্য গত শনিবার পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পেন্টাগনের এসব পরিকল্পনার সবগুলো বা কয়েকটি অনুমোদন দেবেন কি না, তা স্পষ্ট করেননি কর্মকর্তারা।
গত ২০ মার্চ ট্রাম্প ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি কোনো জায়গায় সেনা পাঠাচ্ছেন না। প্রয়োজনে যদি পাঠানও, সেটিও আগেভাগে কাউকে জানাবেন না।
এদিকে গত কয়েকদিন ধরেই ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষের ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে। সে লক্ষ্যে তারা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান কর্তৃপক্ষের কাছে ১৫ শর্তের প্রস্তাবও দিয়েছে। অন্যদিকে তারা ইরানে হামলা জোরদারের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘তেহরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ না করে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের প্রতি হুমকি না থামায়, তবে ট্রাম্প “কঠোর পদক্ষেপ” নিতে প্রস্তুত।’
‘পেন্টাগনের কাজ হলো সম্ভাব্য সব বিকল্প প্রস্তুত রাখা। এটি প্রেসিডেন্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, বা এমনটিই ঘটবে ঠিক তা নয়’, যোগ করেন তিনি।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে সেনা মোতায়েনের সময় পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপটিও দখলে নেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি উপকূলীয় এলাকায় অভিযান চালিয়ে জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টি করতে পারে এমন ইরানি অস্ত্র ধ্বংসের পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অভিযানের সময়কাল কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফ্রান্সে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র স্থলবাহিনী ছাড়াই লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে।’ অন্যদিকে পেন্টাগন সূত্রে বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ‘পেন্টাগন বড় ধরনের বিমান হামলা ও স্থল অভিযান মিলিয়ে ইরানে একটি “চূড়ান্ত আঘাত” হানার পরিকল্পনা করছে। সে লক্ষ্যে অতিরিক্ত আরও ১০ হাজার সেনা পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে এ পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ইরাকে বিমান দুর্ঘটনায় ছয়জন, কুয়েতে ড্রোন হামলায় ছয়জন এবং সৌদি আরবে হামলায় একজন নিহত হন।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত সাতটি দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় ৩০০ জনেরও বেশি সেনা আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পেন্টাগন।
যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের ওপর পরিচালিত জরিপেও ইরানে স্থল অভিযানের বিপক্ষে মতামত উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর বিরোধিতা করেছেন। অন্যদিকে এতে সমর্থন দিয়েছেন ১২ শতাংশ।
বিশ্লেষক মাইকেল আইজেনস্টাড বলেন, খার্গ দ্বীপ দখল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ সেখানে ইরানের ড্রোন ও আর্টিলারি হামলার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, দীর্ঘ সময় এক জায়গায় অবস্থান না করে দ্রুত অভিযান চালিয়ে ফিরে আসাই তুলনামূলক বেশি নিরাপদ কৌশল হতে পারে।
পেন্টাগন সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি প্রায় দুই হাজার ২০০ জনের একটি মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটকে ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে, যারা এ ধরনের অভিযানে সক্ষম। তবে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালাতে তাদের অতিরিক্ত সেনা প্রয়োজন হতে পারে।
এই বিশ্লেষক বলেন, ইরানের কোনো ভূখণ্ড দখল করা সহজ হলেও তা ধরে রাখা কঠিন হবে।


