ছয় ঋতুর বাংলাদেশ যেন দাঁড়িয়ে আছে এক অচেনা প্রান্তে। এখানে এখন আর বসন্ত আসে না, যেন কেবলই পাতাঝরার কাল।
শুষ্ক রাজনীতির বাতাসে ঝরে পড়ে আস্থার সবুজ পাতা। যে মাটিতে একসময় বপন হয়েছিল গণতন্ত্রের স্বপ্নবীজ, সেখানে আজ ঘূর্ণায়মান ধুলো, কেবলই সংশয়।
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের চলতি সংলাপ পর্ব যেন সেই শুষ্ক ঋতুরই এক ‘প্রতীকী চিত্রনাট্য’, যেখানে প্রত্যাশার চেয়ে অনিশ্চয়তার রেখাই বেশি গাঢ়।
অথচ এই সেদিনই রক্তাক্ত জুলাই অভ্যুত্থানের ভেতর থেকে সূচিত হওয়া এ সরকারের যাত্রা ছিল ‘নতুন দিনের প্রতিশ্রুতির’ দীপ্তিতে উদ্ভাসিত। কিন্তু ৯ মাসেই যেন অবিশ্বাসের স্রোতে দিকশূন্য কাগজের নৌকার মতো ভেসে যেতে বসেছে সে সব ‘প্রতিশ্রুতি’।
নির্বাচন কবে হবে– এই প্রশ্ন এখন তুচ্ছ, কারণ মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, দেশের কাণ্ডারী কে থাকছেন? গণতন্ত্রে উত্তরণের দিকনির্দেশার ভবিষ্যতই বা কী?
শনিবার সন্ধ্যায় সংলাপ শেষে বিএনপি নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, ‘যে কোনো উছিলায় নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে, আমরা মনে করি আবারও স্বৈরাচার ফিরে আসার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে।’
‘এর দায়-দায়িত্ব বর্তমান সরকার এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপরে বর্তাবে,’ স্পষ্ট জানান তিনি।
কিন্তু তার এই কথার আড়ালে আরও গভীর সংকেত রয়েছে। যেখানে কিছু উপদেষ্টার ওপর ওঠা অভিযোগ পুরো অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, ছাত্র নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলমকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ‘গোপন প্রভাব’ ও ‘বিদেশি স্বার্থ’ ইঙ্গিত সত্যিই কি ‘ছায়া যুদ্ধ’? নাকি পুরো সরকারই নিরপেক্ষতার ছদ্মবেশে আরেক রাজনৈতিক বিন্যাস? অথবা এটি অন্য কারো ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের একটি উপলক্ষ?
জামায়াতে ইসলামী বরাবরের মতো কৌশলী। তাদের কণ্ঠেও ছিল ‘আস্থার শংকা’, কিন্তু দাবি-দাওয়ায় তারা তুলনামূলক নমনীয়। নির্বাচন, বিচার ও সংস্কারকে আলাদা ট্র্যাকে দেখতে চাওয়া এবং ‘রমজানের আগেই ভোট’ চাওয়া তাদের অবস্থানকে বাস্তবমুখী দেখালেও প্রশ্ন থেকেই যায়, সংস্কার অসম্পূর্ণ রেখে হলেও তারা নির্বাচন চায় কি না? ‘ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন’-এর প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে মতৈক্যে পৌঁছানো জামায়াতের চাওয়া কতটা আন্তরিক, তা তারা স্পষ্ট করতে পারেনি।
অন্যদিকে, এনসিপির ভাষ্য যেন পুরো সংবিধানকেই নতুন করে খতিয়ে দেখার আহ্বান। ‘শেখ হাসিনার আমলে হওয়া সব নির্বাচন অবৈধ’— ঘোষণার দাবির মধ্যে একধরনের ‘রাষ্ট্রীয় ইতিহাস পুনর্লিখনের’ আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলন করে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর অনাস্থা ও একে পুনর্গঠনের দাবিও কী সরকারের শেকড়ে অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ নয়?
এছাড়া তাদের ‘নির্বাচন, সংস্কার ও বিচারের এক সঙ্গে রোডম্যাপ’ ঘোষণার দাবিটিও এই নিদানকালে সরকারের জন্য কতটা অর্থবহ, তা-ও প্রশ্নের অবকাশ রাখে।
এই টালমাটাল মুহূর্তে সংলাপ শুরুর আগে এসেছে প্রধান উপদেষ্টা ও তার পরিষদের এক যৌথ বিবৃতি। যেখানে বলা হয়েছে, ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র ও পরাজিত গোষ্ঠীর বাধার’ মধ্যেও দায়িত্ব পালন করছে সরকার।
আবার এই কাজে ‘অসফল হলে’ কী করবে, তা জানিয়ে সরকার পক্ষ প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিয়েও রেখেছে, ‘যদি পরাজিত শক্তির ইন্ধনে এবং বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সরকারের উপর আরোপিত দায়িত্ব পালনকে অসম্ভব করে তোলা হয়, তবে সরকার সকল কারণ জনসমক্ষে উত্থাপন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।’
বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি এক প্রকার ‘পলিটিক্যাল ব্যাকফুট’। পদত্যাগের সম্ভাবনার ইঙ্গিতও হতে পারে, অথবা সংলাপের ঠিক আগ মুহুর্তে এক ধরনের কৌশলগত চাপ তৈরীর চেষ্টা হওয়াও বিচিত্র নয়।
এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, ইউনূস কি শেষমেষ সত্যিই বিদায়ের পথ ধরছেন? নাকি এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থা রাখছেন তিনি? তবে এ নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি নেতাদের বক্তব্য ও ‘বডি ল্যাংগুয়েজে’ তেমন স্পষ্ট কোনো আভাস মেলেনি।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট ‘প্রতিশ্রুতি রক্ষার’ নয়, বড় সংকট হচ্ছে ‘আস্থার’। রোডম্যাপ নয়, দরকার এমন এক পথপ্রদর্শক, যার প্রতি থাকবে সর্বসম্মত ভরসা। দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র আজ নতুন করে এক ‘জাতীয় ঐকমত্য’ এর দাবি করে—যেখানে নেতা নয়, নীতি হবে মুখ্য।
গণতন্ত্রের এই সন্ধিক্ষণে প্রয়োজন এক নতুন রাজনৈতিক চুক্তি, যার দায়বদ্ধতা হবে জুলাই অভ্যুত্থানের হাজারো শহীদের প্রতি, যাতে অন্তর্বর্তী সরকার আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারে ‘নয়া গণতান্ত্রিক বন্দোবস্তের বাংলাদেশ’।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশ্বাসে দেশ যদি আস্থা হারায়, তাহলে রাষ্ট্র পড়ে থাকবে কেবল একটি ভৌগোলিক খোলসে, যার অবায়ব থাকে, কিন্তু প্রাণ থাকে না।


