গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার একটি তিনতলা ভবনে চলে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল। সেখানে লেজার খাতা খুললে শিক্ষার এক করুণ চিত্র ফুটে ওঠে। এই স্কুলের একজন শিক্ষক মাসে বেতন পান মাত্র ৪ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ একই স্কুলের তিনজন আয়া’র প্রত্যেকের মাসিক বেতন ৬ হাজার টাকা।
আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলার কারিগরদের বেতন মধ্যবিত্ত পরিবারের এক সপ্তাহের বাজার খরচের চেয়েও কম।
এটি কেবল পলাশবাড়ীর চিত্র নয়, বরং দেশের সরকারি সহায়তাহীন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষকের রূঢ় বাস্তবতা। প্রাথমিক শিক্ষা খাতে সরকারের মূল মনোযোগ থাকলেও দেশের ৫০ হাজারেরও বেশি কিন্ডারগার্টেন ও হাজার হাজার মাদ্রাসা অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করলেও শিক্ষকদের জন্য ‘ন্যায্য বেতন’ বিষয়টি এখনো অজানাই রয়ে গেছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে কিছু শিক্ষক এমপিও সুবিধা পেলেও বেসরকারি প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকরা এই সুরক্ষা জালের বাইরে। মফস্বল এলাকায় অনেক শিক্ষকের বেতন এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা। রাজধানীর চিত্রও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ঢাকার মোহাম্মদপুরের শিক্ষক বীথি আক্তার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাঠদান সামলান। বিনিময়ে তার মাসিক বেতন মাত্র ৮ হাজার টাকা।
বীথি আক্তার বলেন, বেসরকারি স্কুল শিক্ষকদের জন্য সরকার নির্ধারিত কোনো বেতন কাঠামো না থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সমাজের কাছে ‘শিক্ষক’ পরিচয়ের সম্মানটুকু ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যতে এমপিওভুক্ত হওয়ার আশায় অনেকেই এই পেশায় পড়ে আছেন। তবে অধিকাংশের জন্য সেই এমপিও সুবিধা একটি মরিচিকা হয়েই রয়েছে।
অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলে শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি, মাসিক বেতন ও পরীক্ষার ফির ওপর। অনেক ক্ষেত্রে এই আয়ের টাকাও ঠিকমতো শিক্ষকদের হাতে পৌঁছায় না।
এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রউফ রশিদ। তিনি একটি কাঠামোগত বেতন ব্যবস্থা প্রবর্তনের ওপর জোর দেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান এবং শিক্ষকদের কর্মপরিবেশ নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বর্তমান বেতন কাঠামো অপর্যাপ্ত এবং খামখেয়ালিপূর্ণ। তিনি এসব প্রতিষ্ঠানকে একটি আইনি কাঠামোর আওতায় এনে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের পরামর্শ দেন।
ময়মনসিংহের ফুলপুরের রহিমগঞ্জ প্রি-ক্যাডেট মাদ্রাসার শিক্ষক মো. বিল্লাল হোসেন জানান, তাদের বেতন কেবল কাগজে-কলমে আছে। মাসে দুই হাজার টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও ছাত্ররা বেতন না দেওয়ায় কোনো মাসে এক হাজার বা দেড় হাজার টাকা পান।
সাভারের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. ইব্রাহিম হোসেন সরদার জানান, তার স্কুলে নতুন শিক্ষকদের বেতন তিন হাজার টাকা। অথচ অফিস কর্মীদের বেতন পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়।
বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মিজানুর রহমান বলেন, পুরো ব্যবস্থাটি প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। সরকার কখনো বেতন কাঠামো নিয়ে তাদের সাথে কথা বলেনি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন সোসাইটির ঢাকা জেলা আহ্বায়ক মো. ইব্রাহিম হোসেন সরদার জানান, অধিকাংশ স্কুল নিবন্ধিত নয়। তাই বেতন কাঠামোর আগে নিবন্ধনের বিষয়টি জরুরি।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মানোন্নয়নেই মূল মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নিয়ে আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নবনিযুক্ত মহাপরিচালক শাহিনা ফেরদৌসী বলেন, তিনি সদ্য দায়িত্ব নিয়েছেন, তাই পরিস্থিতি জেনে মন্তব্য করবেন।
বেতনহীন শিক্ষকতার করুণ উদাহরণ রংপুরের পীরগঞ্জ মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক আলমগীর হোসেন জুয়েল। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তিনি কোনো নিয়মিত বেতন বা ভাতা পান না। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফি ও ফরম পূরণ থেকে সামান্য কিছু টাকা পান। মূলত গরু-ছাগল পালন ও কৃষিকাজ করেই তার সংসার চলে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় অনিয়মিত বা ভুয়া শিক্ষকদের কারণে জটিলতা তৈরি হয়। তবে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা চলছে।
গাইবান্ধার শিক্ষক নন্দন কুমার কর্মকার জানান, তার প্রতিষ্ঠানের স্কুল শাখা এমপিওভুক্ত হলেও কলেজ শাখা না হওয়ায় তাকে টিউশনির ওপর নির্ভর করতে হয়। পরিবারের ছয় সদস্যের ভরণপোষণ মেলাতে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও ইংরেজিতে মাস্টার্স করেছেন যেন টিউশনি পেতে সুবিধা হয়।
কিশোরগঞ্জের একজন কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক জানান, বিকালে পাঁচটি বাড়িতে টিউশনি করে তিনি ১৫ হাজার টাকা আয় করেন, যা তার স্কুলের বেতনের চেয়ে অনেক বেশি।
এই সংকটের বিষয়ে জানতে শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


