জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিয়েছেন গণঅভ্যুত্থানে শহীদের পিতা মো. আব্দুর রহমান।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট লক্ষ্মীপুরে তার ছোট ছেলে ওসমান পাটোয়ারী (২২) শহীদ হন। জবানবন্দিতে আব্দুর রহমান জানান, আন্দোলনে যাওয়ার আগে ফোন করে ওসমান তাকে বলেছিলেন, ‘আব্বু, আমি আজ আন্দোলনে যাব। আমার সঙ্গে হয়তো তোমার আর দেখা হবে না। তুমি আমাকে মাফ করে দিও।’
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ প্রসিকিউশনের এই সপ্তম সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করে। আব্দুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায়। তিনি একজন পল্লী চিকিৎসক। তার এক মেয়ে ও দুই ছেলে ছিল। তার ছোট ছেলে ওসমান জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হন। ওসমান মৃত্যুর আগে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
জবানবন্দিতে আব্দুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ঢাকায় ছিলাম। সেদিন সকালে ছোট ছেলে ওসমান আমাকে ফোন দিয়ে বলে, ‘আব্বু, আমি আজ আন্দোলনে যাব। আমার সঙ্গে হয়তো তোমার আর দেখা হবে না। তুমি আমাকে মাফ করে দিও।’
সাক্ষী জানান, তিনি তখন ছেলেকে আন্দোলনে যেতে বারণ করেন। তারপর তিনি তার স্ত্রীকে ফোন করে ওসমানকে আন্দোলনে যাওয়ার অনুমতি দেওার কারণ জানতে চান। স্ত্রী তখন বলেন, ওসমান আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার গালে ও কপালে চুমু খেয়ে বলেছে, ‘আম্মু, তুমি আমাকে আয়াতুল কুরসি পড়ে ফুঁক দিয়ে দাও, আল্লাহ যেন আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করেন।’
আবদুর রহমান জানান, ওই দিন তার ছেলে ওসমান লক্ষ্মীপুর শহরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে শহীদ হন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা তাহেরের ছেলে সালাউদ্দিন টিপু ও তার সহযোগীরা গুলি করে আমার ছেলেসহ দুজন আন্দোলনকারীকে হত্যা করেছে। টিপু ও তার ছোটভাই বিপ্লব, শাহীন, শিবলুসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা লক্ষ্মীপুরে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে।
এই মামলার সাত আসামি এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের সন্ত্রাসীদের নির্দেশে ও উসকানিতে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন আব্দুর রহমান।
গত ২২ জানুয়ারি ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ওবায়দুল কাদেরসহ মামলার অন্য আসামিরা হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সব আসামি পলাতক।
এর আগে ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি করে সেদিন ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেয়।
এই আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তাদের হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এরপরও তারা গ্রেপ্তার বা হাজির না হওয়ায় তাদের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার হতে আইনে কোনো বাধা নেই।
প্রসিকিউশনের মতে, ওবায়দুল কাদের সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন, জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে যে গণহত্যা হয়েছে, সেই গণহত্যার পরিকল্পনা, নির্দেশ এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একই সঙ্গে তার দলের অন্য নেতারা বিশেষ করে বাহাউদ্দিন নাসিম, আরাফাত পুরো প্রক্রিয়ায় সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে এই হত্যাকাণ্ডকে ফ্যাসিলিটেট করেছেন। ওই সময় পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনীর পাশাপাশি অক্সিলিয়ারি ফোর্স হিসেবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগ সরাসরি আক্রমণে অংশগ্রহণ করেছে এবং নির্মম নিষ্ঠুরভাবে ছাত্রজনতার আন্দোলন দমনে তারা হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, অত্যাচার করেছে, অঙ্গহানি করেছে।
প্রসিকিউশন জানায়, এসব কারণে ওবায়দুল কাদেরকে এখানে কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির কারণে এই মামলার আসামি করা হয়েছে। অন্য যাদের আসামি করা হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই শীর্ষস্থানীয় নেতা; তার নিজ নিজ অর্গানাইজেশনের; সেই কমান্ড রেসপন্সিবিলিটির কারণে তাদের আসামিভুক্ত করা হয়েছে।


