মাদুরাই আন্তর্জাতিক হকি স্টেডিয়ামের নীল টার্ফে যখন ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজল, তখন ডাগআউটে বাংলাদেশের যুবাদের উল্লাস আর গ্যালারিতে থাকা হাতেগোনা দর্শকদের বিস্ময় সব মিলেমিশে একাকার। স্নায়ুক্ষয়ী এক লড়াই, শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা আর আমিরুল ইসলামের জাদুকরী স্টিক, সব মিলিয়ে এক কাব্যিক সমাপ্তি দেখল জুনিয়র হকি বিশ্বকাপ। ১৭-তম স্থান নির্ধারণী ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ৫-৪ গোলে হারিয়ে ‘চ্যালেঞ্জার ট্রফি’র শিরোপা এখন বাংলাদেশের ঘরে। হকির বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সাফল্য।
বিশ্বকাপের মূল পর্ব থেকে ছিটকে পড়া আট দলের লড়াইকে এবার আন্তর্জাতিক হকি সংস্থা (এফআইএইচ) নাম দিয়েছে ‘চ্যালেঞ্জার ট্রফি’। আর সেই চ্যালেঞ্জেই সেরা হলো বাংলাদেশ। তবে জয়ের এই চিত্রনাট্যের মূল নায়ক সেই ডিফেন্ডার আমিরুল ইসলাম। রক্ষণে তিনি যেমন প্রাচীর, আক্রমণে তেমনই বিধ্বংসী। টুর্নামেন্টে নিজের পঞ্চম হ্যাট্রিক তুলে নিয়ে তিনি বাংলাদেশকে নিয়ে গেলেন ভিন্ন এক উচ্চতায়।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য ছিল অস্ট্রিয়ার দাপটে। প্রথম পাঁচ মিনিটেই দুটি পেনাল্টি কর্নার (পিসি) আদায় করে নেয় ইউরোপের দলটি। তবে বাংলাদেশের রক্ষণ ভাঙতে ব্যর্থ হয় তারা। উল্টো প্রথম কোয়ার্টারের শেষ দিকে বাংলাদেশ ম্যাচে ফেরে। পেনাল্টি কর্নার থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন ‘গোলমেশিন’ আমিরুল (১-০)। এর মিনিট দুয়েক আগে অবশ্য তাঁর একটি হিট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল। তবে গোল করার পাশাপাশি নিজের সীমানায় দারুণ ডিফেন্ডিং করে নিশ্চিত গোলও বাঁচিয়েছেন তিনি।
দ্বিতীয় কোয়ার্টারে আবারও পেনাল্টি কর্নার পায় বাংলাদেশ। তবে এবার আর আমিরুল নন, হিট নেন হুজাইফা হোসেন। তাঁর হিটে ব্যবধান দ্বিগুণ (২-০) করে বিরতিতে যায় মেহরাব হোসেন সামিনের দল।
তৃতীয় কোয়ার্টারে রাকিবুল হাসান রকির ফিল্ড গোলে স্কোরলাইন ৩-০ হলে মনে হচ্ছিল জয়টা কেবল সময়ের ব্যাপার। যদিও ৪৪ মিনিটে আন্দোর লোসোনসির গোলে ব্যবধান কমায় অস্ট্রিয়া।
আসল নাটক তখনো বাকি। শেষ কোয়ার্টারে পেনাল্টি স্ট্রোক থেকে ৫০ ও ৫২ মিনিটে পরপর দুটি গোল করে নিজের হ্যাট্রিক পূরণ করেন আমিরুল। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৫-১। মনে হচ্ছিল অস্ট্রিয়া ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছে। কিন্তু তখনই ভয়ংকর হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ। শেষ কোয়ার্টারে ৯টি পেনাল্টি কর্নার আদায় করে নেয় তারা। কেলনার বেঞ্জামিন, কায়সার জুলিয়ান ও নিকোউইয়াক মাতেউসজ, এই ত্রয়ীর তিন গোলে ব্যবধান ৫-৪ এ নামিয়ে আনে অস্ট্রিয়া। শেষ দুই মিনিট ছিল চরম উৎকণ্ঠার। তবে বাংলাদেশ রক্ষণভাগ সতর্ক থাকায় শেষ পর্যন্ত জয়ের হাসি নিয়েই মাঠ ছাড়ে।
ডিফেন্ডার হয়েও যে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া যায়, তা বিশ্বকে দেখিয়ে দিলেন আমিরুল। ৬ ম্যাচে ১৮ গোল, ৫টি হ্যাট্রিক পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে পুরো আসরে তিনি ছিলেন কতটা অপ্রতিরোধ্য। গ্রুপ পর্বে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফ্রান্সের মতো পরাশক্তির বিপক্ষেও গোল পেয়েছেন তিনি। গ্রুপ পর্ব পেরোতে না পারলেও চ্যালেঞ্জার পর্বে ওমান ও কোরিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে আসা, পুরো পথচলায় আমিরুল ছিলেন দলের ধ্রুবতারা।


