হাসান ফেরদৌস মামুন–হুমায়ূন আহমেদের শেষ সিনেমা ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র প্রধান চরিত্রের অভিনেতা। এ চরিত্রের জন্য অভিনয় করে ২০১২ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী’ পুরস্কার পেয়েছেন। আজও এ অভিনেতার স্মৃতিতে হুমায়ূন আহমেদ সমুজ্জ্বল।
মামুন ছোটবেলা থেকে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত। অভিনেত্রী শামীমা নাসরিন তখন হুমায়ূন আহমেদের নাটকের নিয়মিত শিল্পী। হুমায়ূন আহমেদ তখন ‘ঘেটুপুত্র’ চরিত্রটির জন্য অভিনয়শিল্পী খুঁজছিলেন। ব্যাপারটি জানতেন শামীমা নাসরিন। এ অভিনেত্রীর সঙ্গে মামুন এর আগে অনেকগুলো নাটকে অভিনয় করেছেন। তিনি হুমায়ূন আহমেদকে মামুনের ব্যাপারে বলেছিলেন। তখন তাকে নিয়ে আসতেন বলেন হুমায়ূন আহমেদ।
মামুনদের থিয়েটার থেকে তিনিসহ তিনজন গিয়েছিলেন। যাওয়ার পর তাদেরকে একটি সাদা পৃষ্ঠা ধরিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, এটি একটি চিঠি। এটি পড়ে হাসতে হবে। প্রাথমিক পরীক্ষায় তিনজনই উত্তরে যান। এরপর তাদেরকে বলা হয়, চিঠি পড়ে কান্না করতে হবে। এ পরীক্ষায় একমাত্র পাশ করেন মামুন। ‘স্যার আমাকে এসে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, আমার আর্টিস্ট পেয়ে গেছি,’—মামুন স্মৃতিচারণ করলেন প্রথম দিনের।
চলচ্চিত্রটিতে ঘেটুপুত্রকে নাচ জানতে হতো, যার কারণে প্রথম নাট্য ও নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদের কাছে শিল্পী চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাদের কাউকে পছন্দ হয়নি হুমায়ূন আহমেদের। এরপরেই ডাক পড়েছিল মামুনের।
ছবিটিতে যুক্ত হওয়ার গল্পটি ২০০৯ সালের। মামুন জানান, তাদের শুটিং শুরু হয়েছিল ২০১০-এর শুরুতে। এর আগে তাকে মেয়েদের পোশাক পরিয়ে ফটোশুট করা হয়েছিল। মেয়েদের বিভিন্ন পোশাক পরিয়ে দেখেছিল, চরিত্রটিতে তাকে কতটুকু মানায়।
ছবিটির গল্প হাওর অঞ্চলের এক জমিদারকে ঘিরে। এতে দেখানো জমিদার বাড়ীর শুটিং হয়েছে হবিগঞ্জে। তবে জমিদার বাড়ির ভেতরের দৃশ্য শুটিং হয়েছে নুহাশপল্লীতে।
মামুন শুটিংয়ের সময়কার কিছু গল্প বললেন। ‘স্যার কিন্তু শুটিং বেশ সময় নিয়ে করেছেন। দেখা গেছে, আজ আমার শুটিং তো পরের দিন ছুটি। সময় দিয়েছিলেন। কারণ, তিনি চেয়েছেন এক টেকেই যেন শট ওকে হয়। প্রতিদিন রাতের খাবার শেষে স্যার শুটিং ইউনিটের সবাইকে নিয়ে বসতেন। সেখানে কার কোন শটটা ভালো হয়েছে, কোনটা খারাপ হয়েছে, দিনের সেরা পারফর্মার কে–এগুলো আলাপ করতেন।’
হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আরও অনেক স্মৃতি রয়েছে মামুনের। ছবির কয়েকটি দৃশ্যে মামুনকে ছাদের কার্নিশ নিয়ে হাঁটতে দেখা যায় মামুনকে। এ দৃশ্যগুলো ধারণ করার সময় মামুন যতটা নির্বিকার ও নিশ্চিন্ত থাকতেন ততটাই চিন্তায় থাকতেন হুমায়ূন আহমেদ। মামুনের ভাষ্যে, ‘শুটিংয়ে এ ধরনের দৃশ্যে আমি নির্বিকার থাকতাম। কারণ, আমি জানতাম আমার জন্য সকল প্রকার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে রেখেছেন স্যার। যার কারণে আমার কোনো দুশ্চিন্তা হতো না। কিন্তু স্যার ভয়ে থাকতেন। শট শেষে বলতেন, এ নামো, নামো। ছাদে থাকা যাবে না।’
স্মৃতি বলে কি শেষ করা যায়? আরেক দিন মামুন আর মাসুদ আকন্দ (পরিচালক) মিলে সকাল ৭টার দিকে ফটোশুট করতে গিয়েছিলেন নুহাশ পল্লী। তাদের শুট শেষ হতে হতে বিকেল ৩টা সাড়ে ৩টা বেজে গিয়েছিল। দুজনে তখন খেতে গিয়ে দেখে হুমায়ূন আহমেদ খাবার টেবিলে খাবার নিয়ে বসে আছে। মামুন কেন খায়নি এখনো, জানতে চাইলে জানায় তার জন্য অপেক্ষা করছে। একসঙ্গে খাবে। কিছুটা অবাক হন মামুন। কারণ, হুমায়ূন আহমেদ ঠিকঠাক সময়ে খাওয়া-দাওয়া করতেন। মামুন বলেছিলেনও, ‘আপনি খাননি? আপনার তো সমস্যা হবে। খেয়ে নিতেন।’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘একদিন দেরি করলে কিছু হবে না।’
খুব সামান্য এ কথা মামুনের কাছে অনেক দামি হয়ে আছে। ‘তার মতো লোক আমার জন্য অপেক্ষা করবে কেন? এটা দারুণ একটা ভালো লাগার বিষয়, এখনো মনে পড়ে’,—বলেন মামুন।
হুমায়ূন আহমেদ ছাড়াও মামুন কাজ করেছেন সালাউদ্দিন লাভলু, আবুল হায়াতের মতো পরিচালকদের সঙ্গে। তবে তাকে খুব কাজ কাজেই দেখা গেছে। বর্তমানে তো পর্দায় তার কোনো উপস্থিতি নেই। মামুনের ভাষ্যে, তিনি কাউকে ‘তেল মেরে’ কাজ নিতে চান না।
বাবা মারা যাওয়ার পর ২০১৮ সালেই থেমে যায় তার পড়াশোনা। এইচএসসি পাশের কয়েকদিন পরে মোহাম্মদপুরে একটি রড-সিমেন্টের দোকান দিয়েছেন। আপাতত তার ব্যস্ততা ওই দোকান নিয়েই।


