নয়াদিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে বৈঠকের ঠিক আগমুহূর্তে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি। গত এক মাসে ৪ হাজার ৮০০ জন “অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে” বাংলাদেশে পুশইন করার কথা জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
ভারত যখন এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে পুশইন করছে, তখন বাংলাদেশ একে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে চার দিনব্যাপী উচ্চপর্যায়ের সীমান্ত বৈঠক।
ভারতের গণমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৭ জুন এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, যাদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে তারা ভারতের নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন বা সিএএ-এর আওতায় পড়েন না। ভারত সরকারের একটি বিশেষ আইনের আওতায় এসব মানুষকে কারাগারে না পাঠিয়ে সরাসরি বিএসএফ-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের ‘চিহ্নিতকরণ ও বহিষ্কার’ নীতি
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের জনমিতির পরিবর্তন বা জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা করতে তার সরকার ‘চিহ্নিতকরণ, বাদ দেওয়া এবং বহিষ্কার’ নীতি গ্রহণ করেছে। তিনি জানান, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বিশেষ আটক কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে এসব কেন্দ্রে ৮৩৬ জন আটক রয়েছেন, যাদের খুব দ্রুতই বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।
শুভেন্দু অধিকারী আরও উল্লেখ করেন, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকার ১০০ কিলোমিটার জমি বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরবঙ্গের “চিকেনস নেক” বা শিলিগুড়ি করিডোর এলাকাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে এখনো বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের ২,২১৬ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ৫৫৬ কিলোমিটার এলাকা কাঁটাতারবিহীন রয়ে গেছে।
ঢাকার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ঘোষণা
ভারত তাদের এই তৎপরতাকে অনুপ্রবেশ ঠেকানো বললেও বাংলাদেশ একে ‘অবৈধ পুশইন’ হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশের কর্মকর্তা ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো আনুষ্ঠানিক জাতীয়তা যাচাই কিংবা নিয়মতান্ত্রিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ছাড়া এভাবে লোকজনকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিভিন্ন সূত্র ও রেকর্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় তিন হাজার মানুষকে এভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সীমান্ত দিয়ে কোনো মানুষকে পুশব্যাক করার চেষ্টা করা হলে বাংলাদেশ তা শক্তভাবে প্রতিরোধ করবে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও কূটনৈতিক উদ্বেগ
এই পুশইনের সময়কাল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের বিশ্লেষকেরা। সাবেক রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস একে ‘চরম অবন্ধুত্বসুলভ আচরণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভোটব্যাংক ভারী করতেই রাজ্য সরকার এই বিপজ্জনক রাজনৈতিক চাল চালছে।
আরেক সাবেক কূটনীতিক মাহবুব হাসান সালেহ বলেন, ভারতের এই আচরণ তাদের নিজস্ব ‘সবার আগে প্রতিবেশী’ (নেইবারহুড ফার্স্ট) নীতির পরিপন্থী। এর ফলে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও বাড়তে পারে।
বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক
এই চরম উত্তেজনার আবহেই সোমবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের ঐতিহ্যবাহী সীমান্ত বৈঠক।
বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল এই চার দিনব্যাপী সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। বৈঠকে সীমান্ত হত্যা বন্ধের পাশাপাশি সাম্প্রতিক এই জোরপূর্বক পুশইন বা সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রতিবাদ জানানো হবে এবং এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হবে বলে জানা গেছে।


