বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন যুদ্ধবিগ্রহ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ হারাচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট। ফলে দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। ধীরে ধীরে এই মানবিক সংকটের আর্থিক ও রাজনৈতিক দায় এড়িয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। রোহিঙ্গাদের প্রায় পুরো বোঝা এককভাবে চেপে বসছে বাংলাদেশের ওপর।
এই বাস্তবতার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে গত ২০ মে। সেদিন জাতিসংঘ এবং রোহিঙ্গা কোঅর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্ম (আরসিপি) তাদের ২০২৬ সালের যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা (জেআরপি) বৈশ্বিক মানবিক কূটনীতির কেন্দ্রস্থল জেনেভার পরিবর্তে ঢাকায় প্রকাশ করে। যদিও বিষয়টিকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার কাছাকাছি আসার একটি কৌশল বলা হচ্ছে, তবে সমালোচকদের মতে এটি মূলত সংকটের দায় বাংলাদেশের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ারই কৌশল।
বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরের শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়ে আছে ২০১৭ সালের ঢল এবং ২০২৩ সালের শেষের দিকে মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন করে শুরু হওয়া সহিংসতার শিকার আরও দেড় লাখসহ মোট প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা।
কক্সবাজারের মাত্র ২৪ বর্গকিলোমিটারের ৩৩টি ক্যাম্পে নতুন করে তিল ধারণের জায়গা নেই। ফলে নবাগতরা বন্যা, ভূমিধস ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ঠিক এই মুহূর্তে যখন মানবিক সহায়তার চাহিদা তুঙ্গে, তখনই আন্তর্জাতিক মহলে দেখা দিয়েছে ‘দাতা ক্লান্তি’ বা উদাসীনতা।
চলতি ২০২৬ সালের জেআরপি’তে জাতিসংঘ ও তার অংশীদাররা ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলারের তহবিল চেয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ২৬ শতাংশ কম। সংস্থাগুলো স্বীকার করে, এই বরাদ্দ হ্রাস চাহিদা কমার কারণে নয়, বরং বাধ্য হয়ে পরিকল্পনাটিকে কেবল জীবন রক্ষাকারী জরুরি সহায়তার মধ্যে সংকুচিত করতে হয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান জানান, সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিশ্ব একে আর জরুরি বিষয় না ভেবে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠপর্যায়ে বাংলাদেশি এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ প্রায় অর্ধেক বেড়েছে। তবে কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক মহল এখন এই বৈশ্বিক দায় বাংলাদেশ সরকার ও স্থানীয় সংস্থার ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে। একদিকে তহবিল কমছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা ঝিমিয়ে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে যে সংকট বাংলাদেশ তৈরি করেনি এবং যা একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভবও নয়, বিশ্ববাসীর উদাসীনতায় বাংলাদেশ এখন সেই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী অভিভাবক হতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ এর একমাত্র টেকসই সমাধান রয়েছে মিয়ানমারের ভেতরেই, যা আজও সুদূরপরাহত।


