ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড এবং গুলির ঘটনার পর এবার মসজিদের ভেতরে মুসল্লিদের ওপর ভয়াবহ হামলা হয়েছে। এ ঘটনার পর খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এখন চরমে পৌঁছেছে উদ্বেগ। আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহার এবং নৃশংস হামলার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র আতঙ্ক। সূর্যাস্তের পর পুরো শহর এক ভীতিদায়ক পরিবেশে ঢেকে যায়, রাতের নীরবতা ভেঙে প্রায়ই ভেসে আসে কান্নার আওয়াজ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক দুর্নীতি, মাদক সিন্ডিকেট এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসার ওপর ভর করে পুরো মহানগরীজুড়ে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে মেতে উঠেছে অন্তত সাতটি সশস্ত্র দল।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) অপরাধ শাখার পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে গত মে মাস পর্যন্ত ২২ মাসে এই অঞ্চলে প্রায় ৯০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো জড়িত ছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ আটটি থানা এলাকার ১৮১ জন অপরাধীকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে নজরদারি তালিকা তৈরির কাজও শুরু করেছে কেএমপি।
রোববার দৌলতপুরে একটি মসজিদের ভেতরে দুই মুসল্লিকে গুলি করার পর জনসাধারণের মধ্যে উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়। পুলিশ জানায়, ফজরের নামাজের পর সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা মসজিদের ভেতরে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লোকমান হাকিম নামের এক ব্যক্তি যখন মসজিদের ভেতরে বসে কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন, তখন তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। সেই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আলম শেখ নামের আরেক মুসল্লির গায়ে লাগে।
এই সহিংসতার প্রতিক্রিয়ায় সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) কুদরাত-ই-খুদা প্রশ্ন তোলেন, পবিত্র উপাসনালয়ের নিরাপত্তা যদি এভাবে বিঘ্নিত হয়, তবে সাধারণ নাগরিকরা কোথায় নিরাপদ থাকবেন।
তিনি ধারণা করছেন, এসব ঘটনা মূলত আধিপত্য বিস্তারের বিরোধ থেকে তৈরি হয়েছে। কারণ, ওই এলাকার একটি স্থানীয় তেলের ডিপোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সহিংস সংঘর্ষের ইতিহাস রয়েছে।
এ ঘটনার নেপথ্য কারণ সম্পর্কে কেএমপি কমিশনার জাহিদুল হাসান জানান, সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক বিরোধের জের ধরে মসজিদে ঢুকে গুলি চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, তেল ব্যবসা নিয়ে হামলাকারীদের সাথে লোকমান হাকিমের দীর্ঘদিনের শত্রুতা ছিল।
কমিশনার জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারের জন্য জোরালোভাবে কাজ করছে। জড়িতদের পরিচয় জানা গেলেও তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।
হামলা, গুলি ও হত্যাকাণ্ড নিয়মিত ঘটনা
খুলনায় সহিংসতা এখন নিত্যদিনের ব্যাপার। এ ঘটনার মাত্র দু’দিন আগে শহরের লবণচেরা থানার মাথাভাঙ্গা কাজীপাড়া এলাকায় রফিক গাজী নামে এক বিএনপি নেতাকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করা হয়। একটি দোকানের সামনে মোটরসাইকেলে বসে থাকা অবস্থায় তার ওপর এই হামলা চালানো হয়।
এর ঠিক একদিন আগে বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় শহরের আহসান আহমেদ-পিটিআই মোড় সড়কে অবস্থিত সরকারি করোনেশন স্কুলের সামনের রাস্তা থেকে পুলিশ ককটেল উদ্ধার করে। তারও আগে গত ২ জুন খুলনার লবণচরা থানার সাচিবুনিয়া এলাকার একটি স্কুল থেকে মো. রাশেদ নামে এক যুবককে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়।
বস্তিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শুটার
গোয়েন্দাদের একটি উদ্বেগজনক তথ্যে জানা গেছে, শহরের বস্তিগুলো এখন সহিংসতার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এখানকার ৫০টিরও বেশি বস্তি এলাকায় অন্তত ১০০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শুটার বসবাস করছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে এই কিশোর অপরাধী এবং ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার করছে। এরা টাকার বিনিময়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, হত্যাকাণ্ড এবং নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
এদের নেটওয়ার্ক যে কতটা বিস্তৃত, তার প্রমাণ মেলে গত ১৫ মার্চের একটি ঘটনায়। সম্পর্কের টানাপোড়েনের জেরে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে হত্যা করার জন্য খুলনা থেকে ভাড়াটে খুনি দল ভাড়া করা হয়েছিল। এ ঘটনা প্রমাণ করে, এখানকার সন্ত্রাসীরা এখন আঞ্চলিক সীমানাও পার হয়ে যাচ্ছে।
তবে কেএমপি কমিশনার জাহিদুল হাসান একটু ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, চট্টগ্রাম বা অন্যান্য বাইরের অঞ্চলের দ্বন্দ্বের প্রভাবও কখনো কখনো খুলনায় এসে পড়ে।
এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় গত জুনের শুরুতে মহানগরীজুড়ে যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু করে। ১৪ দিনের এই অভিযানে কেএমপি ৬০০ জনেরও বেশি মাদক ব্যবসায়ী, গ্যাং সদস্য এবং বিভিন্ন মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তবে আটককৃতদের মধ্যে বড় কোনো গডফাদার বা মূল হোতা ছিল না।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য একটি বড় ও ব্যাপক অভিযান চালানো অত্যন্ত জরুরি। কারণ, সন্ত্রাসীরা এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক কারণে এই সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। এ সমস্যা সমাধান করতে বেশ সময় লাগবে।
রক্তপাতের পেছনের কারণগুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে কেএমপি কমিশনার জাহিদুল হাসান জানান, সাম্প্রতিক ১৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৫টি পারিবারিক কারণে, ৩টির কারণ এখনো অজানা এবং বাকি ৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বন্ধুদের মধ্যকার বিরোধ, মাদক ব্যবসা অথবা টেন্ডার, বাজার, তেল ও শিপিং ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে।
তিনি নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনাগুলোর পেছনে শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত। বর্তমানে একটি বিশেষ ১০ দিনের অভিযান চলছে, এই অপরাধ চক্র নির্মূল করতে শিগগিরই যৌথ বাহিনীর তৎপরতা আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান জাহিদুল হাসান।


