আওয়ামী লীগের জন্মস্থান ‘রোজ গার্ডেন’ কেমন আছে এখন?

আওয়ামী লীগের জন্মস্থান ‘রোজ গার্ডেন’ কেমন আছে এখন?
রোজ গার্ডেন । ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

পুরান ঢাকার টিকাটুলির ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে এখন আর আগের মতো গোলাপের সমারোহ নেই। বাগানের অনেক গাছে ফুল নেই, কিছু গাছ শুকিয়েও গেছে। একই সঙ্গে কমেছে রাজনৈতিক আনাগোনাও। একসময় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর থাকত প্রাঙ্গণটি। এখন সেই দৃশ্য অনেকটা অতীত।

তবে রাজনৈতিক উপস্থিতি কমে গেলেও দর্শনার্থীদের আগ্রহে ভাটা পড়েনি। প্রতিদিন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, ইতিহাসপ্রেমী ও সাধারণ মানুষ ঘুরতে আসছেন এখানে। রাজনৈতিক পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে রোজ গার্ডেন এখন অনেকের কাছে একটি ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের নিদর্শন।

সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, মূল ভবন ও প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্ন রয়েছে। কয়েকজন কর্মীকে বাগান ও ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যস্ত দেখা যায়। ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন দর্শনার্থীরা। কেউ স্থাপত্যের সৌন্দর্য দেখছেন, কেউ জানতে চাইছেন এর ইতিহাস।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন এই ভবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, যা পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগে রূপ নেয়। সেই কারণেই রোজ গার্ডেন আওয়ামী লীগের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত।

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতার বাইরে। ফলে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের আনাগোনা প্রায় নেই বললে চলে। অতীতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কিংবা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিবসে যে প্রাঙ্গণে নেতাকর্মীদের ভিড় থাকত, সেখানে এখন দেখা যায় মূলত দর্শনার্থীদের উপস্থিতি।

রোজ গার্ডেনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা এক কর্মী বলেন, ‘আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় অনেক নেতাকর্মী আসতেন। এখন সেই ভিড় নেই। তবে দর্শনার্থী কমেনি। অনেকে ইতিহাস জানতে আসেন। আমরা নিয়মিত বাগান ও ভবনের পরিচর্যা করি।’

আরও পড়ুন

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজিম হাসান বলেন, ’রোজ গার্ডেনকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাসের সঙ্গে দেখলে হবে না। এটি পুরান ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তো কমে যায় না।’

পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা আহসানুল হক নামের এক দর্শনার্থী বলেন, ‘ভেতরের পরিবেশ ভালো লেগেছে। ইতিহাসটা তেমন জানা ছিল না। সেটা জানার সুযোগ মিলেছে।’

জানা যায়, রোজ গার্ডেন নির্মাণ করেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জমিদার ঋষিকেশ দাস। বিভিন্ন সূত্রে নির্মাণকাল নিয়ে কিছু পার্থক্য থাকলেও সাধারণভাবে ১৯৩১ সালের দিকে ২২ বিঘা জমির ওপর তিনি এই বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন। চারপাশে দেশ-বিদেশ থেকে আনা বিভিন্ন জাতের গোলাপ লাগানো হয়েছিল বলে এর নাম হয় ‘রোজ গার্ডেন’।

প্রচলিত একটি কাহিনী অনুযায়ী, ঋষিকেশ দাস একবার কাছের বলধা গার্ডেনে আয়োজিত এক সামাজিক অনুষ্ঠানে অপমানিত হন। এরপর তিনি আরও জাঁকজমকপূর্ণ একটি বাগান ও প্রাসাদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। মূলত সঙ্গীতানুষ্ঠান, জলসা ও অভিজাত সমাবেশের জন্যই এই ভবন নির্মিত হয়েছিল। তবে বিলাসী জীবনযাপন ও বিপুল ব্যয়ের কারণে ঋষিকেশ দাস আর্থিক সংকটে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত সম্পত্তিটি বিক্রি করতে বাধ্য হন।

পরে এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের জমিদার বশিরউদ্দিন সরকারের হাতে যায়। পরবর্তীতে ১৯৩৬-৩৭ সালে ঢাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খান বাহাদুর কাজী আবদুর রশিদ সম্পত্তিটি কিনে নেন এবং এর নাম দেন ‘রশীদ মঞ্জিল’।

এটি শুধু একটি নান্দনিক প্রাসাদ নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন এই ভবনেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগের পূর্বসূরি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরে ১৯৫৫ সালে দলটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে রাখা হয় আওয়ামী লীগ।

রোজ গার্ডেন ইউরোপীয় ও গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব বহন করে। ভবনটিতে রয়েছে বিশাল গম্বুজ, করিন্থিয়ান ধাঁচের স্তম্ভ, বেলজিয়ান কাচের জানালা, স্ফটিক ঝাড়বাতি, নাচঘর (বলরুম), মার্বেল ভাস্কর্য এবং অলংকারিক ফোয়ারা। দোতলাবিশিষ্ট এই ভবনের নিচতলায় আটটি কক্ষ এবং ওপরতলায় পাঁচটি কক্ষসহ একটি বড় নৃত্যকক্ষ রয়েছে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৩৩১ কোটি ৭ লাখ টাকায় ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন অধিগ্রহণ করে। পরে এটিকে জাদুঘরে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad