জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ দল এবং এর সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ সাত নেতার সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছে প্রসিকিউশন।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলাটির যুক্তিতর্কের ষষ্ঠ দিনে প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আসামি অন্য নেতারা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সাত আসামির বিরুদ্ধেই আনা চারটি অভিযোগ প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে মানুষ হত্যা ও আহত করার ঘটনায় তাদের দায় রয়েছে। এ কারণে আদালতের কাছে কোনো অনুকম্পা না দেখিয়ে তাদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
‘এই সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা চাই’, বলেন আমিনুল ইসলাম। তার ভাষ্য, এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
যুক্তিতর্কে ওবায়দুল কাদেরের ভূমিকার ওপরও বিশেষভাবে জোর দেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য ছিল দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং উসকানিমূলক। তার অভিযোগ, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ দলটির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় করা হয়েছিল।
চিফ প্রসিকিউটর অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে নিজেদের প্রথম শ্রেণির নাগরিক মনে করত এবং দেশের অন্য জনগণকে দ্বিতীয় শ্রেণির হিসেবে বিবেচনা করত। এমনকি দলের নেতাকর্মীরাও দলীয় অবস্থান থেকে সরে গেলে ছাড় পেতেন না বলে তিনি দাবি করেন।
প্রসিকিউশনের যুক্তি উপস্থাপন শেষে পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম যুক্তিতর্ক শুরু করেন।
শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আমিনুল ইসলাম আসামি ওবায়দুল কাদেরকে রাজনৈতিক জোকার হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকটকাররা ব্যবহার করত। প্রসিকিউশনের দাবি, তার বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের কারণে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে সারা দেশে ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
মামলার অপর ছয় আসামিকে বর্ণনা করতে গিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের আড়ালে থাকা দুর্বৃত্ত, দুর্নীতিবাজ ও দুষ্কৃতকারী। প্রসিকিউশনের মতে, সাত আসামির প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায়ের পাশাপাশি সুপিরিয়র কমান্ড বা ঊর্ধ্বতন কমান্ডের দায় রয়েছে। এসব কারণেই তাদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের যুক্তি অনুযায়ী, ওবায়দুল কাদের তৎকালীন সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলিতে পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ অন্য নেতারাও ওই প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে প্রসিকিউশন দাবি করেছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলন দমনে সহায়ক বাহিনী হিসেবে সরাসরি হামলায় অংশ নেয়। তাদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও অঙ্গহানির অভিযোগও আনা হয়েছে।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল সাত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়। আইনের বিধান অনুযায়ী, আসামিদের অনুপস্থিতিতেও বিচার চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ২২ জানুয়ারি আদালত সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে।
এরপর গত ৪ আগস্ট মামলায় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। টানা পাঁচ কার্যদিবসে প্রসিকিউশন মামলার পটভূমি এবং আসামিদের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও যুক্তি উপস্থাপন করে। বুধবার ষষ্ঠ দিনের যুক্তিতর্কে প্রসিকিউশন তাদের বক্তব্য শেষ করে। এরপর আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক শুরু হয়।


