অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ সাংবাদিক এখনো কারাগারে বন্দি। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এসব মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া এবং নিম্ন আদালতে জামিন না মেলায় অভিযুক্তদের আইনি ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উচ্চ আদালতের একাধিক বেঞ্চে তাদের জামিন আবেদনের শুনানি চলমান থাকলেও এখন পর্যন্ত তা নিষ্পত্তি হয়নি।
জামিন শুনানি ও বর্তমান অবস্থা
একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক বার্তা প্রধান শাকিল আহমেদ এবং সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপার জামিন আবেদনের ওপর গত সপ্তাহে শুনানি হয়েছে। শুনানি শেষে মঙ্গলবার এ বিষয়ে রায় প্রদানের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছে উচ্চ আদালত।
অন্যদিকে ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত এবং একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবুর জামিন নিয়ে হাইকোর্ট প্রায় এক বছর আগে রুল জারি করেছিল। পৃথক মামলায় জারি করা সেই রুলের ওপর এরপর থেকে আর কোনো শুনানি হয়নি। বর্তমানে কারাগারে থাকা অন্য সাংবাদিক হলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সাবেক বিএনপি নেতা শওকত মাহমুদ।
আইনি বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও উদ্বেগ
আইন বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকার কর্মীরা মামলাগুলোর পরিচালনা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, এসব সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। দীর্ঘ সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত এসব মামলার তদন্ত কাজ শেষ হয়নি। এছাড়া বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও তাদের জামিন মঞ্জুর করা হচ্ছে না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইয়ারুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, এই দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ত্রুটিগুলোকেই সামনে নিয়ে আসে। তিনি জানান, বাংলাদেশের তদন্ত প্রক্রিয়া নিজেই ত্রুটিপূর্ণ। তদন্তের সময় পুলিশ প্রায়ই প্রশাসনের দ্বারা প্রভাবিত হয়।
সাংবাদিকদের এসব মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন হওয়া উচিত এবং এটি ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মন্তব্য করেন ইয়ারুল ইসলাম।
সাংবাদিকদের মুক্তিতে দেশ-বিদেশে আহ্বান
বন্দি সাংবাদিকদের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন দেশি সংগঠন ও আন্তর্জাতিক অধিকার রক্ষা সংস্থা ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (সিপিজে) একাধিকবার সোচ্চার হয়েছে। সোমবার আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে সিপিজে। চিঠিতে সংস্থাটি ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল হক বাবু ও শ্যামল দত্তের মুক্তি দাবি করা হয়। পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহারে বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণেরও আহবান জানায় সিপিজে।
বাংলাদেশের সম্পাদক পরিষদও এসব সাংবাদিকদের মুক্তির দাবিতে বারবার বিবৃতি দিয়েছে। ২০২৪ সালের ১৪ জানুয়ারি এক বিবৃতিতে পরিষদ উল্লেখ করে, এ ধরনের মামলা বিদ্যমান আইনের অপব্যবহার এবং এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী।
এছাড়া ২০২৫ সালের ৭ জুলাই বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত ৫০ জনেরও বেশি সাংবাদিক তাদের সহকর্মীদের জামিনের দাবি জানান।
শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপার বিরুদ্ধে মামলা
শাকিল আহমেদ এবং ফারজানা রূপা দীর্ঘদিন একাত্তর টেলিভিশনে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ২২ আগস্ট মেয়েসহ প্যারিস যাওয়ার পথে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাদের আটক করা হয়।
আগের দিন উত্তরা পূর্ব থানায় দায়ের করা একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে মোট ১৩টি মামলা করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট দায়ের করা এমনই একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়, ৫ আগস্ট মোহাম্মদপুরের আদাবর রিং রোডে একটি মিছিলে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা গুলি চালায়। এতে পোশাক শ্রমিক রুবেলসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রুবেল মারা যান।
এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। সেখানে ১৫৬ জন নামীয় এবং ৪০০ থেকে ৫০০ জন অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকায় এই সাংবাদিক দম্পতিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই মামলায় ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট তাদের রিমান্ডে নিয়ে পাঁচ দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্তের জামিন অনিশ্চয়তা
মোজাম্মেল হক বাবুকে ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। ধোবাউড়া থেকে মোজাম্মেল বাবুর সঙ্গে গ্রেপ্তার হন শ্যামল দত্ত। তাকে ভাষানটেক থানায় দায়ের করা ফজলুল করিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে শ্যামল দত্তের বিরুদ্ধে পুলিশ হেফাজতে আলমগীর হোসেন ভূঁইয়া নামে এক ব্যক্তিকে নির্যাতনের অভিযোগে আলাদা মামলা দেওয়া হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার সঙ্গে একটি বৈঠকের সূত্র ধরে ‘গণহত্যা ও উসকানির’ অভিযোগে আরেকটি মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ৪ মে বিচারপতি এএসএম আব্দুল মোবিন এবং বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বাড্ডা থানার একটি হত্যা মামলায় মোজাম্মেল বাবুকে কেন জামিন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। দুই দিন পর একই বেঞ্চ ভাষানটেক হত্যা মামলায় শ্যামল দত্তের জামিন প্রশ্নেও রুল জারি করেন। তবে প্রায় এক বছর হতে চললেও সেই রুলগুলোর ওপর শুনানি হয়নি।
তাদের আইনজীবী নাজমাস সাকিব তুষ্টি বলেন, ‘আমরা আইনকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও তদন্ত শেষ না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা দ্রুত এই রুল শুনানির উদ্যোগ নেব।’
শওকত মাহমুদের উদ্বেগ
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির সাবেক নেতা শওকত মাহমুদকে ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকার মালিবাগ এলাকা থেকে আটক করা হয়। পরে তাকে ‘সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র’ করার অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ।
চলতি বছরের ৩০ মার্চ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা আরেকটি মামলায় তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। সেই মামলার শুনানির পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শওকত মাহমুদ তার ভীতি প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি যদি বেশি কথা বলি, তবে আমার জামিন আটকে দেওয়া হবে।’
তার আইনজীবী ইয়ারুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ যত গুরুতরই হোক না কেন, রায় হওয়ার আগে যে কেউ জামিন পেতে পারেন। আদালতের উচিত নিরপেক্ষভাবে আসামির বিষয়টি বিবেচনা করা।
জামিন পেয়েছেন পান্না ও আনিস আলমগীর
২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে ‘মঞ্চ ৭১’ নামের একটি সংগঠনের গোলটেবিল আলোচনার একজন আলোচক ছিলেন সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না। সেই অনুষ্ঠানে হামলা চালায় একদল উগ্র মানুষ। তবে পুলিশ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো মঞ্জুরুল আলম পান্নাসহ অনুষ্ঠানের আয়োজক-আলোচক ১৫জনকে আটক করে। পরে তাদেরকে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। কয়েক দফা জামিন নামঞ্জুর হওয়ার পর গত ১০ নভেম্বর হাইকোর্ট থেকে জামিন পান পান্না।
অন্যদিকে সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর ধানমণ্ডির একটি জিম থেকে আটক করা হয়। টেলিভিশন টকশোতে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সমালোচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে দুটি পৃথক মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর গত ১৪ মার্চ তিনি মুক্তি পান।


