অবশেষে ঘরে ফিরেছে ঘরের ছেলেরা। ৬ সেপ্টেম্বর নেপালের দশরথ স্টেডিয়ামে পা রেখেছিল বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল, উদ্দেশ্য ছিল দুটি ফিফা প্রীতি ম্যাচ খেলা। প্রথম ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হলেও ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি হঠাৎ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। সরকার পতনের পর রাজধানী কাঠমান্ডুতে কারফিউ জারি হয়, রাস্তাজুড়ে ভাঙচুর আর বিক্ষোভে অচল হয়ে পড়ে স্বাভাবিক জীবন। এমন পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় ম্যাচ তো বাতিল হয়ই, সেই সঙ্গে দেশে ফেরাটাও হয়ে ওঠে অনিশ্চিত।
বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, কর্মকর্তা ও ক্রীড়া সাংবাদিকরা নিরাপত্তা সংকটে পড়ে প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন হোটেলে। চারদিকে ভাঙচুর, আগুন আর উত্তেজনার খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকে। একপর্যায়ে সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করে দেয় ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ফলে লাল-সবুজের প্রতিনিধি দল কীভাবে দেশে ফিরবে, তা নিয়ে তৈরি হয় গভীর শঙ্কা।

পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের নির্দেশনায় এবং বিমান বাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে পাঠানো হয় বিশেষ ফ্লাইট। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি সি-১৩০বি পরিবহন বিমান ১১ সেপ্টেম্বর দুপুরে ঢাকা থেকে কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে উড়ে যায় এবং বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে ঢাকার কুর্মিটোলায় এ কে খন্দকার ঘাঁটিতে অবতরণ করে। নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয় মোট ৫৫ জনকে। এর মধ্যে ২৩ জন ফুটবলার, ৪ জন কোচিং স্টাফ, ১৬ জন ক্রীড়া সাংবাদিক, ১১ জন টিম অফিসিয়াল এবং ১ জন ছাত্র প্রতিনিধি ছিলেন। মিশন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ সেলিম জাভেদ, পিএসসি।
সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি, ডিজি অপারেশন্স অ্যান্ড প্ল্যানস জানান, ‘১১ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টা ৫৩ মিনিটে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি বিমান নেপালে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা খেলোয়াড়, সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।’ তিনি আরও বলেন, প্রধান উপদেষ্টা, জাতীয় ক্রীড়া সংস্থা, বাফুফে ও নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাস সকলে মিলেই এ উদ্ধার কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করেছে।
বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল এই কঠিন সময়ে নেপাল থেকে দলকে ফিরিয়ে আনার পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে বলেন, ‘প্রথমেই আমি কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে। আমাদের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা আর সাংবাদিকদের নিরাপদে দেশে ফেরাতে তারা অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। শুরুতে প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে আমাদের কিছুটা সময় লেগেছিল, কারণ হোটেলের পাশেই ভবনে আগুন দেওয়ার খবর পাচ্ছিলাম। তাই বিকল্প আবাসনের প্রস্তুতিও রেখেছিলাম। পাশাপাশি সরকার, সেনাপ্রধান ও বিমান বাহিনী প্রধান বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় হওয়ার পর বিমান বাহিনী দ্রুত উদ্ধার অভিযানে নামে।’
তিনি আরও জানান, শুধু খেলোয়াড় নয়, খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককেই এ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ‘আমরা চেয়েছি সাংবাদিকসহ সবাই নিরাপদে দেশে ফিরুক। উদ্ধার কার্যক্রমে যারা জড়িত ছিলেন তারা দিন-রাত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। উপরওয়ালার রহমতে আমরা সফল হয়েছি।’

তবে খেলোয়াড়দের মানসিক অবস্থার দিকেও নজর দিচ্ছে বাফুফে। এ বিষয়ে তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘নেপালের মতো পরিস্থিতি থেকে ফিরলে অনেকেই মানসিক আঘাত পেতে পারে। হংকং ম্যাচের আগে আমরা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করব। যারা মানসিক সহায়তা নিতে চাইবে তাদের আমরা দেখভাল করব। পাশাপাশি যারা অংশ নেবে না, তাদেরও স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরতে সহযোগিতা করব। অনেকে মানসিক ধাক্কা খাওয়ার পাশাপাশি শারীরিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেসব বিবেচনায় নিয়েই আমরা কাজ করব।’
এই উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হলো, দেশের বাইরে বিপদে পড়লেও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। আর জাতীয় দলের খেলোয়াড় ও সাংবাদিকরা ঘরে ফেরায় ক্রীড়াঙ্গন থেকে শুরু করে সমর্থকরাও পেয়েছেন বড় স্বস্তির নিঃশ্বাস।


