আইন ভেঙে দুজন গ্রাহককে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে নিয়ে যেতে সহযোগিতা করায় ব্যাংক এশিয়াকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২৪ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগ এই জরিমানা করে।
জরিমানার অর্থ বেসরকারি খাতের এই ব্যাংকটিকে পরিশোধ করতেই হবে বলে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রে আপিলের কোনো সুযোগ নেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ব্যাংকের সংশ্লিষ্টতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিদ্যমান আইনে সর্বোচ্চ জরিমানা করা হয়েছে ব্যাংক এশিয়াকে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ফারহানা করিম ও আলায়না চৌধুরী নামে দুজন গ্রাহক কয়েক ধাপে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার ডলার বিদেশে নিয়ে যান, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এই কাজে তারা রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট একাউন্ট (আরএফসিডি) ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে আলোচ্য দুই গ্রাহক এই অর্থ নিয়ে বিদেশে ব্যবহার করেছেন। তারা আইন ভেঙে একই আরএফসিডি হিসাবে তারা বিভিন্ন লোকদের দিয়ে বারবার নগদ ডলার জমা করেছেন। এই ডলারগুলো খোলা বাজার বা কার্ব মার্কেট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা বিধান অনুযায়ী, একজন বাংলাদেশি নাগরিক প্রতি বছরে সর্বোচ্চ ১২ হাজার মার্কিন ডলার বিদেশে ব্যয় করতে পারেন। তবে আরএফসিডি হিসাবে জমা করা পুরো অর্থ বিদেশে ব্যবহার করা যায়। তবে এই হিসাবে মুদ্রা জমা করার নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশ ভ্রমণ শেষে দেশে ফেরার সময় ১০ হাজার ডলারের কম মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা কোন ঘোষণা ছাড়াই সঙ্গে রাখতে পারেন। এই অর্থ নগদ সংরক্ষণ কিংবা ব্যাংক ও মানি চেঞ্জারে বিক্রি করতে পারেন। পাশাপাশি আরএফসিডি হিসাবে জমাও করতে পারেন। কিন্তু ১০ হাজার ডলারের বেশি মুদ্রা দেশে নিয়ে আসলে বিমান বা স্থল বন্দরে নির্দিষ্ট ফরম (এফএমজে) পূরণ করে ঘোষণা দিতে হয় এবং সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে এই মুদ্রা আরএফসিডি হিসাবে জমা করতে হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ফারহানা করিম নামের গ্রাহক প্রায় এক বছর আগের বিদেশ ভ্রমণের তারিখ দেখিয়ে একাধিকবার ১০ হাজার ডলারের বেশি মুদ্রা অ্যাকাউন্টে জমা দিয়েছেন। কখনো একই দিনে কয়েকবার অর্থ জমা করেছেন। এভাবে কয়েক ধাপে তার ব্যাংক হিসাবে প্রায় দেড় লাখ ডলার জমা করা হয় যেগুলোর কোন ঘোষণাপত্র ছিল না।
আবার এই অর্থ ফারহানা করিমের পক্ষে অন্য ব্যক্তি জমা করেছেন। যখন ডলারগুলো জমা হয়েছে তখন ফারহানা করিম কখনো কখনো দেশের বাইরে ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, এসাব অর্থ ওই গ্রাহক বিদেশে কার্ড ব্যবহার করে খরচ করেছেন।
একইভাবে আলায়না চৌধুরী নামে একজন গ্রাহকের ক্ষেত্রেও একই অনিয়ম খুঁজে পেয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল। তিনিও বিদেশে অবস্থানকালে আরেকজন ব্যক্তির মাধ্যমে আরএফসিডি অ্যাকাউন্টে ৬৮ হাজার ডলার জমা করেছেন। এই অর্থ তিনি কার্ডের মাধ্যমে বিদেশে ব্যয় করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কার্ব মার্কেট থেকে এই ডলারগুলো সংগ্রহ করে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয়েছে যা অর্থ পাচারের পর্যায়ে পড়ে।
ব্যাংকের সহায়তা বা সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এভাবে নিয়ম ভেঙে ধারাবাহিকভাবে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অ্যাকাউন্টে জমা করে বিদেশে ব্যয় করা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। যে কারণে এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাচারের প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এ ধরনের কার্যক্রম ব্যাংকিং চ্যানেলের প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন করে। ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে যাতে তাদের চ্যানেল ব্যবহার করে কেউ অর্থ পাচার করতে না পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংককেও আরও নজরদারি বাড়াতে হবে।’
জরিমানার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইনকে একাধিকবার ফোন করা হলে ও ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।


