রাজধানী ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকার বাদ্যযন্ত্রের দোকান ‘অ্যাকোস্টিকা’য় এখন শুধুই সুনসান নীরবতা। এই নিরবতা প্রতিষ্ঠানটির মালিক সৈকত বিশ্বাস টুটুলকে বেশ কষ্ট দেয়। আগের মতোই দোকানে গিটার, কি-বোর্ড কিংবা ড্রামস সাজানো থাকলেও ক্রেতা না থাকায় অলস সময় কাটছে তাদের।
টাইমস অব বাংলাদেশ’কে টুটুল জানান, আগে সারাদিন দোকানে ক্রেতাদের ভিড় থাকত। যারা বাদ্যযন্ত্র কিনতে আসত, তারা বাজিয়ে দেখার সময় সুর তুলত, যা শুনতে খুব ভালো লাগত। কিন্তু এখন আর মানুষ আসে না বললেই চলে। বিক্রি নেই, আর যন্ত্র থেকেও আর সুর ওঠে না।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই ব্যবসায় মন্দা শুরু হয়, যা দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। তার মতে, বিক্রি ৬০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। ফলে কর্মীদের বেতন ও দোকান ভাড়া দেওয়ার মতো দৈনন্দিন খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতি কেন হলো জানতে চাইলে টুটুল বলেন, হামলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া ও সহিংসতার ভয়ে এখন গিটার হাতে রাস্তায় নামতেও তরুণরা ভয় পায়।
দুই বছর ধরেই সারাদেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে বাধা দেওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ লাইনসে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলাকালে মাদ্রাসা ছাত্ররা ভাঙচুর চালায়। পরে ‘ভবিষ্যতে কোনো কনসার্ট করা যাবে না’—এমন দাবিতে তারা রাত আড়াইটা পর্যন্ত রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। একই দিনে কিশোরগঞ্জ পুরোনো স্টেডিয়ামে বিকালে একটি ব্যান্ড শোর আয়োজনে বাধা দেয় ইমাম-উলামা পরিষদ।
এসব ঘটনার সরাসরি ধাক্কা এসেছে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসায়। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড, সায়েন্স ল্যাব, বসুন্ধরা সিটি কিংবা শাঁখারীবাজারের মতো বড় বাদ্যযন্ত্রের বাজারগুলোতে এখন নীরবতা। একসময় যেখানে বিক্রেতারা ক্রেতাদের সামলাতে ব্যস্ত থাকতেন, সেখানে এখন দিনের পর দিন বেচাকেনা ছাড়া সময় পার করতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, দেশে কনসার্ট ও স্টেজ শো কমে যাওয়ার কারণেই বাদ্যযন্ত্রের বাজারে এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
বসুন্ধরা সিটির ‘গিটার সেন্টার’-এর ম্যানেজার প্রলয় ঘোষ জানান, খোলা মাঠে কনসার্ট হওয়ার ওপর বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা অনেকটাই নির্ভর করে। কিন্তু কনসার্ট কমে যাওয়ায় ব্যবসা আটকে গেছে। তিনি জানান, আগে যেখানে মাসে গড়ে ১০টি গিটার বিক্রি হতো, এখন তা কমে ৩-৪টিতে নেমে এসেছে। শৌখিন ক্রেতাদেরও এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না।
‘মেলোডি অ্যান্ড কোং’-এর মালিক শঙ্কর সরকার বলেন, কনসার্টে সরাসরি গিটার বা ড্রামস বাজাতে দেখলেই তরুণরা এগুলো শেখার উৎসাহ পায়। কিন্তু কনসার্ট কমে যাওয়ায় শিখতে আসার আগ্রহও কমছে।
অন্যদিকে ‘যতীন অ্যান্ড কোং’ ও ‘মিউজিক পয়েন্ট’-এর কর্মীরা জানান, দোকানের খরচ চালাতে না পেরে অনেকে ব্যবসার আকার ছোট করছেন কিংবা যৌথভাবে দোকান চালাচ্ছেন।
বাংলাদেশে বাদ্যযন্ত্রের বাজারের নির্দিষ্ট কোনো সরকারি হিসাব নেই। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে তৈরি ও আমদানি মিলিয়ে এ বাজারের আকার প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা। গিটার, পিয়ানো, ড্রামসহ প্রায় ১২ ধরনের বাদ্যযন্ত্র বিদেশ থেকে আনা হয়। এছাড়া ভারত থেকে আসে তবলা ও ঢোল। তবে জার্মান গবেষণা সংস্থা স্ট্যাটিস্টার তথ্য মতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে এই বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।
কনসার্ট বন্ধের প্রভাব পড়েছে শিল্পীদের রুজি-রোজগারেও। সংগীতশিল্পী শিমলা আক্তার খেদ প্রকাশ করে বলেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কমে যাওয়ায় শিল্পীদের কাজের সুযোগ কমে গেছে। তিনি চান, সরকার এমন পরিবেশ তৈরি করুক যাতে শিল্পীরা নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন।
মিউজিক স্টুডিওর প্রযোজক শরিফের মতে, সংগীতশিল্পের অবস্থা এখন খুবই খারাপ। কনসার্ট তো দূরের কথা, সামাজিক মাধ্যমে গান নিয়ে কাজ করতে গিয়েও বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। গান বন্ধ করার মানে অনেকের কাজের সুযোগ নষ্ট করা, যা মোটেও ভালো কথা নয়।
জনপ্রিয় রক ব্যান্ড ‘আর্ক’-এর সদস্য আজিজুর রহমান টিংকু বলেন, কনসার্টে নিরাপত্তার জন্য পুলিশের থেকে সঠিক সহযোগিতা মিলছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই নীরবতা আয়োজক ও শিল্পীদের ভয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে ব্যান্ডগুলো নতুন শো নিতে ভয় পাচ্ছে।
টিংকু মনে করিয়ে দেন, একটি কনসার্টের সাথে মঞ্চ, সাউন্ড, পরিবহন ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসাসহ অনেক কিছু জড়িত। তাই কনসার্ট না হলে পুরো সংগীতকেন্দ্রিক অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরিস্থিতি বিচারে সংগীতশিল্পী আসিফ আকবর সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশে ‘গান বাজবে কি বাজবে না’—তা সরকারের কাছে সরাসরি জানতে চেয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জানান, সরকার পুরো বিষয়টি জানে এবং এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।


