সয়াবিন তেল: বাজারের নিয়ন্ত্রণ ব্যবসায়ীদের দিতে চান বাণিজ্যমন্ত্রী

সয়াবিন তেল: বাজারের নিয়ন্ত্রণ ব্যবসায়ীদের দিতে চান বাণিজ্যমন্ত্রী
ফাইল ছবি
Advertisement
Advertisement

সয়াবিন ও পাম তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা সরাসরি বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার পক্ষে সায় দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। মন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তে বাজারে নতুন করে সিন্ডিকেট ও কারসাজির শঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা মূল্যস্ফীতিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষের পকেটে আরও বড় টান ফেলবে।

সয়াবিন তেলের মতো নিত্যপণ্যের দাম সরকার থেকে বেঁধে দেওয়ার বর্তমান নিয়ম তুলে দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে।

এমন এক সময়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যখন ভোজ্যতেল শোধনকারী মালিকদের সংগঠন তেলের দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে।

সরকারের এমন ভাবনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এক সাবেক বাণিজ্য সচিব। টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘মাত্র তিন-চারটি কোম্পানি পুরো তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এখানে সরকারের নজরদারি থাকা অত্যন্ত জরুরি। সরকার যদি এই ক্ষমতা ছেড়ে দেয়, তবে ভোজ্যতেলের বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।’

১৯৫৬ সালের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আইন অনুযায়ী, যেকোনো জরুরি পণ্যের দাম ঠিক করে দেওয়ার আইনগত ক্ষমতা সরকারের রয়েছে।

বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমে তেল শোধনকারী সমিতি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব সরকারের কাছে জমা দেয়। এরপর ট্যারিফ কমিশন আন্তর্জাতিক বাজারের দর ও দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি খরচ হিসাব করে তেলের একটি দাম সুপারিশ করে।

সবশেষে, ট্যারিফ কমিশন ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে খুচরা বাজারে তেলের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

তবে প্রতিবারই তেলের দাম বাড়ানোর আলোচনা শুরু হলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার পরপরই কোম্পানিগুলো বাজারে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেয়, ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ ক্রেতারা।

আরও পড়ুন

খুচরা ব্যবসায়ীরা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে সরবরাহ আটকে রাখার অভিযোগ করলেও কোম্পানিগুলো তা অস্বীকার করে। অন্যদিকে, গণমাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির খবর না আসা পর্যন্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও সাধারণত কোনো ব্যবস্থা নেয় না।

এবারও লিটারে সয়াবিন তেলের দাম ১০ টাকা এবং পাম তেলের দাম ১৭ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার পর থেকেই বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত না নিলেও বাধ্য হয়ে ক্রেতাদের এখন বাড়তি দামেই তেল কিনতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কবে হবে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বিচিত্র বড়ুয়া টাইমসকে বলেন, ‘বাণিজ্যমন্ত্রী সয়াবিন তেলের দামের বিষয়টি বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে চান। আমরা ইতিমধ্যে একটি সভা করেছি। সেখানে মন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তেলের দাম আর সরকার ঠিক করবে না। এটা মুক্ত বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে।’

তিনি আরও জানান, দাম বাজারের ওপর ছাড়লেও বাজার যাতে ঠিকঠাক চলে এবং তদারকি করা যায়, সে জন্য একটি নতুন ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী।

অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ মেনে ব্যবসায়ী সমিতিও সঠিক বাজার পরিচালনার জন্য একটি প্রস্তাবিত রূপরেখা জমা দিয়েছে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, তারা বর্তমানে ব্যবসায়ীদের দেওয়া সেই প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই করছেন।

বিদ্যমান নিয়ম বাদ দিয়ে মন্ত্রী কেন দাম নির্ধারণের ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চাইছেন–এমন প্রশ্নের জবাবে বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’

এ বিষয়ে জানতে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাকে বারবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি, তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠালেও কোনো উত্তর আসেনি।

ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কঠোর বিরোধিতা করেছেন আরেক সাবেক বাণিজ্য সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের (কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) বর্তমান সভাপতি হিসেবে তিনি টাইমসকে বলেন, ‘ভোজ্যতেলের দাম যদি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে কোম্পানিগুলো তাদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে দেবে। কারণ দেশে তেলের শোধনাগার মাত্র তিন থেকে চারটি। তারা খুব সহজেই একসঙ্গে বসে নিজেদের মতো দাম ঠিক করে ফেলতে পারবে। এখন অন্তত সরকার দাম নির্ধারণ করে বলে তাদের সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে হয় এবং দাম পর্যালোচনা করা হয়। মুক্ত বাজারে ছেড়ে দিলে সেই নিয়ন্ত্রণ আর থাকবে না।’

তবে বাণিজ্যমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন টি কে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আতহার তাসলিম।

টাইমসকে তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বেই মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু আছে। সেখানে ব্যবসা করবে একজন আর পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেবে আরেকজন–এটা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মের পরিপন্থী। আমি মনে করি, বাংলাদেশেরও আন্তর্জাতিক মুক্তবাজার অর্থনীতির পথেই হাঁটা উচিত।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর