ছিনতাইয়ের মামলায় রায়ের নজির বিরল

ছিনতাইয়ের মামলায় রায়ের নজির বিরল
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

রাজধানীতে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া মানুষদের জন্য আসামির গ্রেপ্তার হওয়া কেবল আইনি লড়াইয়ের শুরু মাত্র। বহু মামলা বছরের পর বছর আটকে থাকে। অন্যদিকে, জামিনে বের হয়ে আসামিরা আবারও পুরোনো অপরাধে ফিরে যায়।

আইনজীবী ও পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ছিনতাইয়ের ঘটনায় কেউ খুন হলেই কেবল তদন্তে কিছুটা তোড়জোর দেখা যায়। নিয়মিত খোঁজ না নেওয়া, সাক্ষীর অভাব আর দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার কারণে অধিকাংশ মামলায় শেষ পর্যন্ত কোনো রায় হয় না।

বংশালে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে মুদি দোকানদার আবদুল কুদ্দুস খুনের ১০ বছর পর, গত ১২ আগস্ট আসামি মাসুম মিয়া ওরফে কালুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

অথচ ২০২২ সালে পশ্চিম কাজীপাড়ায় ছিনতাইয়ের সময় ছুরিকাঘাতে নিহত দন্ত চিকিৎসক আহমেদ মাহী বুলবুল হত্যা মামলাটি আজও আলোর মুখ দেখেনি।

আইনজীবীদের মতে, ছিনতাইয়ের মামলায় রায় হওয়া পর্যন্ত লড়াই গড়ায় কেবল তখনই, যখন সঙ্গে খুন বা বড় কোনো জখমের ঘটনা ঘটে।

ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ছিনতাইয়ের মামলায় রায়ের নজির খুবই কম। তদন্ত ঠিকমতো না এগোনোর কারণে বেশির ভাগ মামলাই ঝুলে থাকে।

আদালতের তথ্য বলছে, ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোতে পুলিশ নিজেই ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মামলা দায়ের করে। তবে আসামি ধরা পড়লেও উপযুক্ত সাক্ষীর অভাবে মামলা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে আবারও অপরাধে নেমে পড়ে।

জামিনে ছাড়া পেয়ে অনেকেই আর আদালতে হাজিরা দেয় না। ফলে তাদের নামে আবার পরোয়ানা জারি হয়। তবে নতুন করে অন্য কোনো অপরাধ না করা পর্যন্ত পুলিশ সাধারণত তাদের আর ধরে না।

বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভুক্তভোগীরাও বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দেন। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বারবার আদালতে দৌড়াদৌড়ি, সময় নষ্ট আর অনিশ্চয়তার কারণে বাদীপক্ষ একসময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শিথিল হয়ে পড়ার সুযোগে ছিনতাই বেড়ে গেলে মানুষের ক্ষোভ বাড়ে। কিন্তু এরপরও অনেকে ঝামেলা এড়াতে মামলা করতে চান না, আর যেসব মামলা হয় সেগুলোর গতিও থমকে থাকে।

গত শনিবার সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান বগুড়ার এক স্কুলশিক্ষিকা। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

আরও পড়ুন

তবে ঘটনাটি সাধারণ মানুষের নজর না কাড়লে বা সংবাদমাধ্যমে আলোচনা না হলে এত দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নজির কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আসামি ধরা পড়লেও নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মো. তৌহিদুল হক বলেন, আইনের দুর্বল প্রয়োগ আর ধীরগতির কারণেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

তিনি টাইমসকে বলেন, ছিনতাইকে যখন ছোটখাটো অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, অপরাধীরা সেই সুযোগটাই নেয়।

তিনি আরও জানান, পড়াশোনা, চাকরি বা সামাজিক জীবন থেকে ছিটকে পড়া মানুষ, বিশেষ করে মাদকাসক্তরা একসময় এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ ওসমান গনি জানান, টানাটানির সংসার আর সহজে জামিন পাওয়ার সুযোগই তাদের বারবার অপরাধে টানছে।

তিনি বলেন, জামিনে বের হয়ে অনেকেই আবার একই কাজ করে। পেশাদার ছিনতাইকারীদের ঠিকমতো তথ্য-প্রমাণসহ আদালতে তুলতে পারলে এই অপরাধ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফারুক হোসেন ফারুকী বলেন, যারা বারবার ধরা পড়ছে তাদের ওপর কড়া নজর রাখা দরকার। এদের মূল দলগুলোকে ভেঙে দিতে হবে।

কয়েকজন আসামির পেছনের ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়, পুরোনো মামলা ঝুলে থাকার ফাঁকে কীভাবে তারা নতুন নতুন অপরাধ করে যাচ্ছে।

গত ১ জুলাই শেওড়াপাড়া ও শেখেরটেক এলাকায় ছিনতাইয়ের চেষ্টার অভিযোগে মোহাম্মদ শফিক নামের একজনকে ধরে পুলিশ। পরে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে ২০১৫, ২০১৮ এবং ২০১৯ সালেও চুরি, হামলা, হত্যাচেষ্টা ও হুমকির অভিযোগে তিনটি মামলা রয়েছে। সেগুলোর একটিরও রায় হয়নি।

একইভাবে, গত ১১ মে আদাবর থেকে ছিনতাইয়ের প্রস্তুতির সময় মোহাম্মদ পলাশ নামের এক তরুণকে গ্রেপ্তারের পর তার নামেও পুরোনো তিনটি মামলার খোঁজ মেলে। জানা যায়, প্রতিটি মামলায় সে মাত্র ৫ হাজার টাকার বন্ডে জামিন পেয়েছিল।

তার একটি মামলা ছিল হত্যাচেষ্টা ও আঘাতের, আর বাকি দুটি ছিল মাদকের। রাজধানীর ছিনতাইয়ের ধরণ দেখে দেখা যায়, অপরাধীরা মূলত ব্যস্ত রাস্তা, বাস-লেগুনা, কাঁচাবাজার ও আবাসিক এলাকাগুলোকে বেছে নেয়।

দণ্ডবিধির ৩৯২ ধারা অনুযায়ী, ছিনতাই বা ডাকাতির শাস্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা।

আর ছিনতাইয়ের সময় কেউ আহত হলে ৩৯৪ ধারা অনুযায়ী সাজা হতে পারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা। ভুক্তভোগী মারাত্মক আহত হলে বা মারা গেলে ধারা আরও কঠিন হয়।

শিক্ষিকা মৃত্যুর মামলায় গ্রেপ্তার ২

রাজধানীতে ছিনতাইয়ের চেষ্টার সময় রিকশা থেকে পড়ে নিহত স্কুলশিক্ষিকা রনজিনা হত্যা মামলার মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-২।

গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান আসামির নাম মোহাম্মদ পনি ওরফে ‘পাড়া পনি’। বসিলা থেকে তাকে ও তার সহযোগীকে ধরা হয়। ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও জব্দ করেছে র‍্যাব।

বগুড়া থেকে চোখের চিকিৎসা করাতে ঢাকায় এসেছিলেন রনজিনা। মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টান দিলে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর তার স্বামী শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর