গুমের বিচারের ধীরগতি, বাড়ছে স্বজনদের আকুতি

গুমের বিচারের ধীরগতি, বাড়ছে স্বজনদের আকুতি
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে গুমের ঘটনায় বিচারের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে। কিন্তু তদন্ত আর বিচারে গতি না থাকায় দিন দিন ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে এসে তাদের সেই দীর্ঘশ্বাস আরও ভারী হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের প্রচুর অভিযোগ এখনো জমা পড়ে রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে তিনটি মামলার বিচার কাজ চলছে। আর মানবতাবিরোধী অপরাধের ৩৮টি অভিযোগের তদন্ত চলছে, তদন্তের জন্য তালিকায় রাখা হয়েছে আরও অন্তত ৫০টি ঘটনা। এ ছাড়া শত শত অভিযোগ এখনো জমা পড়ে আছে।

ট্রাইব্যুনালে মামলার পাহাড় জমলেও রায় এসেছে মাত্র ৬টির। বড় বড় বেশ কিছু মামলায় এখনো সাক্ষীদের কথা শোনাই শেষ হয়নি।

গত বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু করে। ডিজিএফআই পরিচালিত গোপন আস্তানা ‘আইন যৌথ জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রে’ (জেআইসি) মানুষ আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক ও বর্তমান ১২ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠিত হয়। পাশাপাশি টিএফআই সেল সংক্রান্ত মামলায় আসামি করা হয় আরও ১৭ জনকে। পরে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধেও গুম ও খুনের মামলা হয়। কিন্তু আট মাস পার হয়ে গেলেও এসব মামলায় মূল সাক্ষ্যগ্রহণের কাজই আটকে আছে।

বিচারের এই ধীরগতি নিয়ে স্বজন ও মানবাধিকারকর্মীরা চরম হতাশ। তবে ধীরগতির কথা মানতে নারাজ প্রসিকিউশন পক্ষ।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলছেন, কাজ থেমে নেই। এক সঙ্গে অনেকগুলো মামলার বিচার চলছে। আসামিদের পক্ষ থেকে আলাদা আলাদা আইনজীবী দল সাক্ষীদের জেরা করছেন, যার কারণে সময় একটু বেশি লাগছে। প্রতিদিন চার-পাঁচটি মামলার শুনানি হওয়ায় একটির কাজ চললে অন্যটির কাজ বন্ধ রাখতে হয়।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, একটি মামলা শেষ হতে তিন থেকে পাঁচ মাস লেগে যায়। সামনে যেভাবে অভিযোগ আসছে, তাতে বিচারক, তদন্তকারী ও প্রসিকিউটরের সংখ্যা না বাড়ালে আদালত একা এই চাপ সামলাতে পারবে না।

আরেক প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী জানান, গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত করা সবচেয়ে কঠিন। কারণ, নিখোঁজ বহু মানুষের আজও হদিস মেলেনি, তাই পুরনো এসব ঘটনার প্রমাণ জোগাড় করা খুব জটিল। তার ওপর আসামির সংখ্যা বেশি, একজন সাক্ষীকে প্রায় এক মাস ধরে জেরা করার ঘটনাও আছে।

তদন্তাধীন বড় মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০১২ সালে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও তার ড্রাইভার গুমের ঘটনা। প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনায় বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানের নাম এসেছে।

একই সঙ্গে সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল বনানী থেকে তারা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তাদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন আহমেদের গুমের অভিযোগের তদন্ত শেষ পর্যায়ে আছে এবং দ্রুতই আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন।

যাদের স্বজন হারিয়ে গেছে, তাদের কাছে সান্ত্বনা বা ক্ষতিপূরণের কোনো মূল্য নেই। তারা চান আসল ন্যায়বিচার। জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ড ও গুমের শিকার পরিবারগুলোর একটাই দাবি—বিচারে দেরি হওয়া মানেই তাদের যন্ত্রণা বাড়া।

গুমের শিকার হওয়া সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান বলেন, বিচার অত্যন্ত ধীরে চলছে। নির্দিষ্ট একটা সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করা উচিত। মামলা সামলাতে নতুন আদালত ও তদন্তকারী দল তৈরি করা এখন জরুরি।

গুম প্রতিরোধ দিবসে এসে বড় প্রশ্ন একটাই–আশ্বাসের বাণী ছেড়ে স্বজনহারা এই পরিবারগুলো কি শেষ পর্যন্ত সময়মতো ন্যায়বিচার পাবে?

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর