কেন তারেক রহমানকে ভারত সফরে চায় দিল্লি

কেন তারেক রহমানকে ভারত সফরে চায় দিল্লি
ছবি: পিএমও
Advertisement
Advertisement

সাধারণত বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের ভেতরের চিত্র কোনো সরকারি ইমেইল থেকে খুব কম সময়ই প্রকাশ পায়। কিন্তু চলতি মাসের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে পাঠানো একটি বার্তা দ্রুত কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের নজর কাড়ে।

ইমেইলে পাঠানো বার্তার বরাতে বিবিসির খবরে বলা হয়, দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে অনুষ্ঠিতব্য সাপ্তাহিক ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। কারণ সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মহড়ার আয়োজন করা হচ্ছে।

অথচ ওই ইমেইল পাঠানোর আগ পর্যন্তও তারেক রহমানের ভারত সফর সম্পর্কিত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইমেইলটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে বাংলাদেশের নতুন সরকার প্রধানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা জল্পনা আরও বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জোরালো কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভারতের আগ্রহের বিষয়টিও সামনে আসে।

অবশ্য তারেক রহমানের প্রেস সচিব এএএম সালেহ সেই জল্পনার ইতি টেনে জানান, তারেক রহমান এখনো ভারতের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি। এমনকি তার দিল্লি সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

ভারতের কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের বরাতে বিবিসি জানায়, পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী দেশের নেতাকে আলোচনার জন্য দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানাতে ভারত আগ্রহী। এর সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল বিজয় পেয়ে ক্ষমতায় আসার পর এটিই হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর।

এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন যুগের সূচনা করে। এর আগে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন। ওই আন্দোলনে শত শত মানুষ নিহত হন। এরপর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন এবং এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি ঘটে।

কাজেই নতুন সরকার বাংলাদেশের শাসনভার নেওয়ার পর এখন দিল্লি আশা করছে, তারেক রহমান দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করবেন। একইসঙ্গে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলছে।

গণঅভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও বিচার প্রক্রিয়ায় হাজির হতে দেশে ফেরননি।

ঢাকা একাধিকবার শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য দিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে।

এএএম সালেহ বলেন, ‘আমরা একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছি এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দ্রুত করার বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে জবাবের অপেক্ষায় আছি।’

ভারতও জানিয়েছে, বিষয়টি তারা বিবেচনা করছে।

এই বিরোধ থাকা সত্ত্বেও দিল্লি বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। তারেক রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ভারত তাকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানায়। পাশাপাশি বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বাংলাদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে ‘সর্বোচ্চ সম্মান’ দেওয়া হবে এবং ‘স্মরণীয় অভ্যর্থনা’ জানানো হবে বলে জানিয়েছেন দীনেশ ত্রিবেদী।

প্রতিবেশী কোনো দেশের নেতাকে আমন্ত্রণ জানাতে ভারতের পক্ষ থেকে এমন প্রকাশ্য আগ্রহ সাধারণত দেখা যায় না।

আরও পড়ুন

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শ্যাম শরণ বলেন, ‘আমার ধারণা, দিল্লিতে কিছুটা হতাশা রয়েছে। কারণ শেখ হাসিনাকে হস্তান্তর করা ছাড়া ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য তারা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক কিছু প্রয়োজন পূরণে ভারত উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং চিকিৎসার জন্য ভিসা প্রদান। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহজ করার লক্ষ্যে বেশ কিছু দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাও আবার চালু করা হয়েছে।’

তবে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর উভয় দেশেরই বড় স্বার্থ জড়িত।

দুই দেশ চার হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে নেয়। পাশাপাশি রয়েছে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্ক। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যার বড় অংশই ভারতের পক্ষে ছিল।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক।

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দুই দেশ সড়ক, রেল ও বন্দর যোগাযোগ সম্প্রসারণ করে। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাতায়াত সহজ হয়। একই সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাও বৃদ্ধি পায়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারত দাবি করেছিল, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সক্রিয় থাকা উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তবে বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, দিল্লি বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগগুলো উপেক্ষা করেছে। আওয়ামী লীগ সভাপতির ভারতে অবস্থান এখনো সেই উত্তেজনা ধরে রেখেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার বিদেশি সংবাদদাতাদের সংগঠনের আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আওয়ামী লীগ প্রধান। সেখানে তিনি আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার তার সমর্থকদের দমন করছে বলে অভিযোগ করেন।

ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থান নিয়ে শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে দেশবিরোধী কথা বলার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ তুলে তাৎক্ষনিকভাবে দিল্লির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকার।

জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং সেখানে বলা কোনো বক্তব্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিষয়ে কোনো বক্তব্যকে তারা সমর্থন করে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘শেখ হাসিনার ওই বক্তব্য দেওয়ার আগে ঢাকায়ও এমন খবর ছিল- তারেক রহমান ভারত সফরের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।’

‘এটি (শেখ হাসিনার বক্তব্য) বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে কতটা আন্তরিক, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে’, যোগ করেন তিনি।

এমন পরিস্থিতিতে দিল্লি সফর করলে তারেক রহমানকে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে বলে শঙ্কা দেখা দেয়।

তবে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক পুনর্গঠনের আগ্রহ শুধু শেখ হাসিনাকে ঘিরে নয়। তার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশ ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

ঢাকা ও ইসলামাবাদ উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর বিনিময় করেছে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করেছে। দিল্লি এসব বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

২০০০-এর দশকে ভারত অভিযোগ করেছিল, পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ ও সীমান্ত পারাপারে সহায়তা করেছে। সে সময় পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয়েই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।

সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ঘোষিত ‘মক্কা চুক্তিও’ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে অনেক দেশকে আগ্রহী করে তুলছে। এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে চলতি মাসে যুক্ত তিনটি দেশই প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্র। গুঞ্জন উঠেছে অন্য সদস্যরা চাইলে বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিতে পারে।

যদিও মক্কা চুক্তির বিস্তারিত বিষয় এবং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর দায়িত্ব এখনো স্পষ্ট নয়। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ইউরোপীয় সামরিক জোট ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি, যেখানে একটি সদস্য দেশের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যদি কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি হয়, তাহলে আমাদের জন্য এতে অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়। এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।’

সম্প্রতি সৌদি আরবও তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে বাংলাদেশকে ওই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

আরও পড়ুন: মক্কা চুক্তি: কৌশলগত পথের মোড়ে ঢাকা

অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, ঢাকার এ বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক হওয়া উচিত। এটি শুধু ভারতের সঙ্গে বৈরিতার বিষয় নয়। বাংলাদেশকে কিছু সময় অপেক্ষা করে দেখতে হবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে এবং সেটি দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।’

বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা ভারতের জন্য এমন একটি বার্তা যা প্রমাণ করে- বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পরিবর্তিত হচ্ছে। শেখ হাসিনার আমলে যে অসাধারণ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তা বাংলাদেশের বর্তমান বা ভবিষ্যত সরকারের সঙ্গেও একইভাবে বজায় থাকবে, দিল্লি এখন আর তা ধরে নিতে পারে না।

অন্যদিকে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতিও যে প্রতিবেশী ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল নয় সেটিও তারেক রহমানের দেখানো প্রয়োজন।

অধ্যাপক ইয়াসমিনের মতে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকের আগে তারেক রহমানের দিল্লি সফর করা উচিত। তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশীদের একসঙ্গে বসবাস করতেই হয়।’

খুব শিগগিরই ভারত সফরে তারেক রহমানের সামনে আরেকটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ভারত ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করবে এবং সেই সম্মেলনে বাংলাদেশকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

কয়েক সপ্তাহের আমন্ত্রণ, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং একটি আগেভাগে প্রকাশ হয়ে যাওয়া ই-মেইলের পর এখন দিল্লি আশা করছে, শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান ভারতে আসবেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর